অদৃশ্য অভিসার (অধ্যায় ১) - অর্ক আশফাক
অধ্যায় ১
অদৃশ্য অভিসার
- অর্ক আশফাক
মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে গেলে আজকাল আর কিছুই স্পষ্ট মনে হয় না। সম্পর্ক—এই শব্দটা একদিন খুব স্বাভাবিক, খুব সহজ মনে হতো। এখন তার আড়ালে অসংখ্য গিঁট, অস্পষ্টতা আর অজানা মানসিক জটিলতা লুকিয়ে আছে।
সময় যত এগিয়েছে, হৃদয়ের ভেতর একটিই প্রশ্ন কেবল আরও বেশি করে দানা বেঁধেছে—একজন মানুষ কি সত্যিই আরেকজন মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে? জীবনের দীর্ঘ ৩৯ বছরে নানা রকম অভিজ্ঞতায় সম্পন্ন হয়ে, গুটিকয়েক সম্পর্ক পেরিয়ে এসে আমি আজও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরি। উত্তরটা যতই খুঁজি, ততই একটা অনুভূতি দৃঢ় হয়—না, মানুষ আসলে কেবল নিজেকেই ভালোবাসে।
মানুষ তার অস্তিত্ব, তার অনুভূতি, তার ব্যর্থতা ও সফলতাকে ভালোবাসে। আর সেই আত্মকেন্দ্রিক ভালোবাসারই এক ঝলক, এক উপশাখা হলো সম্পর্ক নামের এই সামাজিক অভিনয়। এই ভালোবাসার ভেতরে রয়েছে ভয়, শঙ্কা, প্রত্যাশা, নিরাপত্তাহীনতা আর সর্বোপরি নিজেকে প্রমাণ করার এক গভীর চেষ্টা।
তবে কি প্রেম মিথ্যে?
না, প্রেম মিথ্যে নয়। প্রেম শিল্পের মতো—দেখতে সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী, স্পর্শ করলে অদৃশ্য। এটি বাস্তব জীবনের এক অলীক শিল্প, যা মানুষ বেঁচে থাকার জন্য রচনা করে, আবার ভেঙে ফেলে নিজেই।
মানুষ প্রেমে পড়ে না, প্রেমের ভাবনায় পড়ে। এই ভাবনার মধ্যেই সে নিজেকে দেখতে পায় এক অলৌকিক দৃশ্যপটে—যেখানে সে একজন প্রেমিক, অথবা প্রেমিকা, কবিতা পড়ছে, গান শোনাচ্ছে, অথবা নিঃশব্দ কোনো বিকেলে কারো জন্য অপেক্ষা করছে।
না মানুষ প্রেম নয়, 'প্রেমের কল্পনা'র প্রেমে পড়ে।
প্রেম নামক ভাবনাটা কে ভালোবাসে!
তাই তো প্রেম নিয়ে এত গান, এত কবিতা, এত আর্তি! সাদামাটা লৌকিক প্রেম আমাকে আর টানে না। প্রেমের জন্য মানুষ চায় এক ধরণের মহাজাগতিক আবেগ—যার কাছে বাস্তবতা নিতান্তই তুচ্ছ। সে চায় প্রেম হোক কল্পনার মতো—ছবির মতো, কবিতার মতো।
পাওয়া যাবে না, তবু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জীবন কাটবে।
এমন এক প্রেমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমি ভাবি—কারও মুখে “তুমি সুন্দর” শুনে কারও হৃদয়ে যদি ঢেউ ওঠে, যদি সেই ঢেউ ভবিষ্যতের দিকে একটি পথ দেখাতে শুরু করে, তবে কি সেটাকেই প্রেম বলা যায় না?
কিন্তু সেই অনুভূতির পথ কি নিরাপদ?
নাকি সেই আবেগই একদিন বিপন্ন করে তোলে পুরো স্বত্তাকে?
প্রেম যখন আবিষ্কারের পর্যায়ে থাকে, তখন তার উত্তেজনাও থাকে তুঙ্গে। ভয় কাজ করে না। হৃদয় তখন মুক্ত, ভাবনার গতি অবারিত। কিন্তু প্রেম যখন ঘনিয়ে আসে, যখন তা বাস্তবের কাছাকাছি চলে আসে—তখনই জন্ম নেয় ভয়।
ভয় হয় — নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ফেলার, হারিয়ে ফেলার, অথবা খুব কাছাকাছি আসার পর দূরে চলে যাওয়ার।
কারণ সত্যি বলতে কি, অধিকাংশ প্রেমেই কেউ না কেউ নিজের আবেগকে গোপন রাখতে শেখে। কারণ সে জানে, প্রেমে সবটা উজাড় করে দিলেই হয়তো ফুরিয়ে যাবে আকর্ষণ, ফুরাবে কৌতূহল। প্রেম তখন দাঁড়াবে চুক্তির সামনে—'তুমি থাকবে, আমি থাকব', এই শর্তে।
এই যে অনিশ্চয়তা, এটাই প্রেমকে গভীর করে তোলে।
এটাই তাকে কবিতা বানায়।
এটাই প্রেমকে করে তোলে এমন এক অনুভব, যাকে ছুঁয়ে দেখা যায় না, কিন্তু বারবার ফিরে যেতে হয়।
তবু মানুষ ভালোবাসে।
ভালোবাসার সাহস করে।
কেউ একজন যখন কারো হৃদয়ে নিজেকে কল্পনা করে, তার কণ্ঠে শুনে গানের কথা, তার পাঠানো কবিতায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব—তখন সেই মানুষ প্রেমিক হয়।
প্রেম তখন আর কেবল অনুভব নয়, তখন তা হয়ে ওঠে জীবনের উদ্দেশ্য।
তবু প্রশ্নটা রয়েই যায়—এখনো কি এমন হয়? এখনো কি কেউ কাউকে হৃদয়ের সমস্ত কথা বলে, নিজেকে উজাড় করে দেয়?
নাকি আজকের প্রেম কেবল পরস্পরের প্রতি সাময়িক প্রয়োজন, একাকীত্ব ঢাকার সহনীয় মাধ্যম?
এমন সময়েই কেউ যদি এসে বলে—“তোমাকে ভালোবাসি,” তাহলে কি তাতে সব প্রশ্নের জবাব মেলে?
হয়তো মেলে না।
তবে ভালোবাসার কথাটা শোনাও তো একধরনের শিল্প। সেই শিল্পকে কেউ লুকিয়ে রাখে, কেউ গলা ছেড়ে গায়, আবার কেউ কেবল চোখে রেখে যায়।
ভালোবাসা এখনো আছে।
তবে তা গভীরে, অনেক দূরে।
এতটাই অধরা যে, একে পাওয়া যায় না, শুধু তার পেছনে ছুটে চলা যায়।
যতটা ভাবনা নিয়ে বলা যায়, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, ততটাই সাহস লাগে তা সত্যিই বিশ্বাস করতে।
কেউ হয়তো দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে চায় এই প্রেমের কথা, আর কেউ চায়—শুধু একটুকরো গান, একটুকরো ছবি।
তবুও, আশার কথা থাকে।
কথা থাকে, “আবার দেখা হবে আমাদের।”
এটাই হয়তো প্রেম—একটা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এক অদৃশ্য অভিসার, যা বাস্তবের হাত ছুঁয়ে বারবার ফিরে যায় কল্পনার আকাশে।
(চলবে)

Comments
Post a Comment