জনৈক মুরুব্বী - অর্ক আশফাক
"গুরুজনেরা বলেন -
চরিত্র না ঠিক থাকলে জীবনের সিকিভাগ অর্থহীন!
জবান যদি না ঠিক থাকে, তাহলে নাকি জীবনের অর্ধেকটাই নিরর্থক।
ভালোবাসা, প্রেম, সম্মান, বিশ্বাস তথা মনুষ্যত্ব যদি না থাকে, তবে নাকি জীবনের বারো আনাই নিরস!
আর যদি বোধশক্তি না থাকে তাহলে জীবনের পুরোটাই শেষ।"
মোহাম্মদপুরের একটি জনপ্রিয় চায়ের দোকানে কথা গুলো চা খেতে খেতে বলছিলেন সত্তর বয়োশর্ধ জনৈক মুরুব্বী। তখন বাজে সন্ধ্যা ৭টা! দোকানের আশেপাশেই নাকি ওনার বাসা। চা খেতে খেতে শুনছিলাম উনি এবং আরেকজন মুরুব্বীরা কথোপকথন। ওনারা কথা বলছিলেন আগেকার সময় বনাম এখনকার সময় নিয়ে!!
প্রথম মুরুব্বী বললেন উনি নতুনধারার চেতনাকে সাধুবাদ জানান, এবং আজকালকার তরুণদের উনি খুব পছন্দ করেন, কারণ ওরা তাঁদের আমলের ছেলেপিলের থেকে অনেক অনেক স্মার্ট।
তবে দুজনেই আবার পুরোন দিনের জীবনকেই নানা কারণে পছন্দ করেন। তন্মধ্যে আচার, ব্যবহার, শিষ্টাচার, মেয়েদের পর্দা, পোশাক আশাক, সব মিলিয়েই তিনি সত্তর আশির দশক কে নব্বই এর দশক কিংবা এখনকার সময় থেকে বহু বহুগুণ উপরে রাখেন বলে প্রথম মুরুব্বী জানান তাঁর পাশের জনকে। দ্বিতীয়জন বললেন, যে দেশপ্রেম উনি ১৯৭১ এ দেখেছেন, তার ছিটেফোঁটাও আজ আর অবশিষ্ট নেই।
তার সাথে প্রথমজন পুরোপুরিভাবে একমত পোষণ করলেন। তিনি আরো বলছিলেন যে আগেকার দিনের মোবাইল ছাড়া দুনিয়া খুব মিস করেন। ফোন করে কথা বলার যে শান্তি, চিঠির জন্য অপেক্ষার যে মজা, হাজার কষ্টের ভেতর থেকেও কোনো নেক উদ্দেশ্যে সৎ থাকার সন্তুষ্টি, এটা আজকালকার ছেলেপিলে নাকি বুঝেনা। আর উনি সেই দারুণভাবে প্রেরণা ধরে রেখেছেন শুধু ওনার নতুন বউ এর জন্য।
চায়ের শেষ চুমুকের সাথে জানতে পারলাম তাঁর প্রথম স্ত্রী সদ্যই গত হয়েছেন। ৩মাসের ভেতরেই উনি বিয়ে করে ফেলেছেন, কারণ ওনার কষ্ট হোক এটা নাকি ওনার গত স্ত্রী সহ্য করতে পারবেন না।
প্রথমজনের এহেন কথায় দ্বিতীয়জন অট্টহাসি দিয়ে একটু চা ফেলে দিলেন। আর কাপটি রেখে মুখে সদ্য পাওয়া পান টি হাতের মোচড়ে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললেন, "বন্ধু, এই কথা বলে তুমি নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারো, কিন্তু তাতেই কি কথাটি সত্য হয়ে যাবে?"
এরপরে যা হল, সেটার জন্য আমার চোখ প্রস্তুত ছিল না।
প্রথম মুরুব্বীর হোয়াটসআপ এ কল এলো... ভিডিও কল!
আমি পাশেই বসা ছিলাম, তাই স্পষ্ট দেখতে পেলাম অনেক কমবয়সী একটা মেয়ে, একেবারে অর্ধবসনে স্ক্রিনে আসলো! উনি সাথে সাথে তিনি কল কেটে দিয়ে উঠে চলে গেলেন। এমনভাবে উনি হতভম্ব হয়েছিলেন যে পাশের জনের বারবার করা প্রশ্ন, "মেয়েটা কে রে?" এর উত্তরও তিনি দিচ্ছিলেন না!!
তার ওপরে উনি টাকা না দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন বিধায় দোকানদার চিৎকার করে বলে উঠলেন -
" ***** কাকা, বিলটা দিলেন না?" (সঙ্গত কারণেই নামটা উহ্য রাখলাম)। মুরুব্বী একটু আস্তে করেই জনাব দিলেন, "বাকি লিখে রাখো। আজকে একটু তাড়া আছে"!
পাশের জন বলেই চলেছেন, "কিরে ***** (নাম), কে মেয়েটা?"
আমি অবাক হয়ে ভাবছি, মেয়েটা কি ওনার মেয়ে? নাহ এটা মনে হচ্ছে না ওনার মেয়ে!
ততক্ষনে মুরুব্বী জোরপায়ে হাঁটা শুরু করেছেন। কি যেন ভেবে আমিও সায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে মুরুব্বীর পিছে পিছে গেলাম। দুই গলি পরেই "আল শেফা ফার্মেসি" তে ঢুকে পড়লেন মুরুব্বী। সোজা হেঁটে চলে গেলেন সামনে বসা লোকটির সামনে। হালকা চাপা কিন্তু উত্তেজিত গলায় বললেন, "এক প্যাকেট দিও তো, লাস্টবার যেটা নিলাম।"
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সানি লিওনের ছবি সম্বলিত প্যাকেটটা, নতুন প্যাকেজিং আর নতুন ডিজাইনের নামকরা MANFORCE SUNNY EDITION কনডম প্যাকেট তার হাতে দেয়া হলো।
"আহা, ৩টার না, ১০টার প্যাকেটটাই দাও!", মোটামুটি চিৎকার করেই বললেন মুরুব্বী।
আমি আর কিছু না দেখে মুচকি হেসে বেড়িয়ে পড়লাম ফার্মেসি থেকে।
যাক বাংলার মুরুব্বীরা এখনও শক্তিমান রয়েছেন, ভেবেও খুশি লাগলো।
তবে পুরোন প্রশ্নটা আবার আমার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো -
"তাই বলে মুরুব্বী এত ছোট বয়সী মেয়েকে কি বিয়ে করলেন? আর পাশের ভদ্রলোকটি যখন চিনেন না, তারমানে দ্বিতীয় স্ত্রীও তো মনে হয় না...
আচ্ছা পেডোফাইল কেস নয়তো ??"
না!!!! না!!!! না !!!!
আমি আর অন্যের ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করবনা, মনে মনে এই কথা ঠিক করে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

Comments
Post a Comment