আমার চোখে মামা রবিউল হুসাইন - অর্ক আশফাক

 



পরিচিতিঃ

রবিউল হুসাইন ছিলেন একজন স্থপতি, কবি, শিল্পী, শিল্প সমালোচক, ছোট গল্পের লেখক, প্রাবন্ধিক এবং এছাড়াও তিনি সংস্কৃতিকর্মী হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার রতিডাঙ্গা গ্রামে। তিনি কুষ্টিয়া মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন। তারপরে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ১৯৬৮ সালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে আর্কিটেকচারে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক শেষ হওয়ার পরই আর্কিটেক্ট হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি ছাত্রকাল থেকেই নিয়মিত লিখতেন।
আমার মনে রবির প্রথম উপলব্ধিঃ
১৯৯৮ সালের সেই দিনটির কথা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে। আমি তখন ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি। বিছানায় শুয়ে, একা একা কবিগুরুর এই গানটি গাইছিলাম, “যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে”… ঠিক সেই সময়ে কখন যে বড় মামা পেছনে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার গান শুনছিলেন, টেরই পাইনি! উনি মুখে সেই চিরাচরিত হাসি নিয়ে বললেন, “হুমম্‌, নিয়মিত গানটা গেলেই তো পারিস, গলা তো খারাপ না!”
শুনে আমি তো একদম চুপ! ইশশ্‌ কি লজ্জা! কি মনে করল মামা! আমার দেরি দেখে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “গানটা গা তো আবার প্রথম থেকে!”
আমি আবার গানটা প্রথম থেকে গাইলাম। এক জায়গায় থেমে গিয়েছিলাম, উনি গানের কথা ধরিয়ে দিলেন আর আমার সাথে নিজেও গুনগুন করে গাইলেন। গান শেষ করলাম। উনি বলে উঠলেন -
“ও কিরে! ভালই তো গান গাস! এত গলা চেপে গান গাচ্ছিস কেন?” ধমকের সুরে গলা কিছুটা উঁচিয়েই বললেন তিনি, “গলা ছেড়ে গা !”…
এভাবেই তাঁর সাথে আমার সখ্যতার শুরু, এরপর কোনদিন আমি উনার সামনে ভয় পাইনি, উনার রাগ কিংবা ধমক খাইনি, বরং পেয়েছি আদর মাখা শাসন, ভালবাসা, অভিভাবকত্ব এবং গান, কবিতা কিংবা গল্প লিখার দিক-নির্দেশনা।
ব্যক্তি রবিউলঃ
মানুষ হিসাবে উনার তুলনা নেই বললেই চলে। এত সরল-সাবলীল কথা, লাজলজ্জা কিংবা লোকে কি ভাববে তা নিয়ে চিন্তা না করা, বিশ্বের মোটামুটি সকল বিষয়েই তাঁর জ্ঞান ছিল সমীহ করার মত। আর মানুষ হিসাবেও অতি সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন তিনি। আমার এই ছোট্ট জীবনে ব্যক্তি রবিউল হুসাইনকে আমি পেয়েছি এবং দেখেছি একজন অভিভাবক (মামা), ফ্যাশনেবল, স্টাইলিস্ট, একজন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গল্পকার, সমালোচক, গায়ক, কমেডিয়ান, স্থপতি, সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বত্তার একজন গুণমুগ্ধ ধারক হিসেবে।
কেন জানি মায়ের পরিবারের সবচেয়ে বড় মানুষটাকে খুব সমীহ করতাম। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে একমাত্র এই মানুষটিই খুব সরলভাবে অনেক কঠিন এবং সত্য কথা বলে দিতেন। এমনকি অনেক রাগের বা কড়া কথাও তিনি এমন করে বলতেন যে কেউই তাতে রাগ নয় বরং তীব্র বিবেক দংশনে ভুগবে এই ভেবে যে ‘কি করলাম আমি’! উনি আমাকে যে কতবার এসে ঠাট্টাচ্ছলেই কত বড় সমস্যার সমাধান দিয়ে গেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। আমার চোখে দেখা সেরা মানুষ তিনি!
অতি সাধারণ তবুও অসাধারণঃ
মামা ছিলেন অতি সাধারন ব্যক্তি! তিনি লোক দেখানো, নার্সিসিজম, বড়াই, ক্ষমতার অপব্যবহার খুবই অপছন্দ করতেন। একটা বুক খোলা শার্ট, খাকি প্যান্ট, হাতে ব্রেসলেট, গলায় লকেট, চোখে চশমা আর শীতের দিনে গলায় স্কার্ফ… এই ছিল তাঁর ফ্যাশন সেন্স! তা যে খুবই আকর্ষণীয় ছিল, তা বলাই বাহুল্য।
তিনি কেমন মানুষ ছিলেন, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই…
আমার মনে আছে আমার বি.বি.এ. করার পর মামাকে বলেছিলাম যদি ভাল একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দেয়া যায়। তিনি বললেন, “আগে এম.বি.এ. কর”। তারপর এম.বি.এ. করলাম এবং তাঁকে সি.ভি. দিলাম। উনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি বিষয়টা দেখব কিন্তু আমি কাউকে সরাসরি তোর চাকরীর কথা বলতে পারব না। যদি কখনও কথা উঠে তখন আমি বলবো”।
এতেই বুঝা যায় তিনি কতটা পক্ষপাতিত্বহীন!
উনি বিশ্বাস করতেন “কর্মেই পরিচয়, নামে বা বর্ণে নয়”!
আরেকটা ব্যক্তিগত স্মৃতি শেয়ার করি… ২০১১ সালে আমি পরিবার কে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করি। তখন কেউই আমার এই বিয়ে মেনে নেয়নি! না আমার পরিবার, না আমার স্ত্রীর পরিবার। তখন একমাত্র কাছে টেনে নিলেন এই বড় মামা (রবিউল হুসাইন)। তিনি আমার স্ত্রীর ভাইকে চিনতেন, তাই কথা বললেন আর আমাদেরকে মেনে নিলেন, আর আমার পরিবারকেও বুঝালেন। এরপর থেকে মামার সাথে আমার বোঝাপড়াটা ছিল অন্য মাপের। আমি অনেক কিছুর জন্যই তাঁর কাছে শলা-পরামর্শ করতে আসতাম। আর টেকনোলজিকাল যে কোন কিছু না বুঝলে আমি তাঁকে বুঝাতাম।
একাত্তরে রবিউলঃ
১৯৭১ সালে ঢাকা বিমানবন্দরের আন্ডারগ্রাউন্ড নকশা (যাতে করে হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলাচল করা যায়) নিয়ে রবিউল হুসাইন বিমানবন্দর থেকে বেবি ট্যাক্সি করে পুরান ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর নিকট দেবার সময় পথিমধ্যে তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে হানাদার বাহিনী তাঁকে পথরোধ করে। উনি তখন ধরেই নিয়েছিলেন যে ঐদিনই তাঁর মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে! তিনি সে যাত্রায় নকশা লুকিয়ে, আর উর্দু ভাষায় কথা বলে বেঁচে যান এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর নিকট নকশা পৌঁছে দেন। একাত্তরের ৯মাস জুড়েই চাকরীর পাশাপাশি তাঁর মুক্তিবাহিনীর প্রতি কৃত কার্যকলাপ ছিল অবিস্মরনীয়!
রবিউলের দুষ্টুমি ও শিল্পী স্বত্তাঃ
মামা ইচ্ছা করেই অনেক মজা করতেন। যেমনঃ
· অনেক সময়ই তিনি কিছু চাইলে মুখে কিছু বলতেন না। হাতে ইশারা করতেন। তারপর যদি অনেকক্ষণ পরেও কেউ না বুঝত, তাহলে চিৎকার করে রাগ করার ভান করে বলতেন, বুঝো না কেন? বোবা হলে কি করতে?”
· তারপর যদি খেতে গিয়ে কেউ বিষম খায়, তাহলে মাথায় হাত দিয়ে “ষাট ষাট” না বলে তিনি বলতেন “সত্তর সত্তর”…
· কেউ যদি বেশি খাবার প্লেটে তুলে দিতে যেত, তিনি “বাস, বাস” না বলে বলতেন “ট্রাক, ট্রাক”…
· এরকম মজার মানুষ ছিলেন মামা। আমাদের পরিবারের ভেতর অনেক গানই তিনি নিজে লিখে গেয়ে থাকতেন নানান সময়ে। পরিবারে কারও জন্মদিনে, তিনি কেক কাটবার সময়ে বলে উঠতেন- “আজকে তোমার জন্মদিনে জানাই ভালবাসা, সুখে থেকো, ভাল থেকো, এই আমাদের আশা!”
· “তুমি যে আমার” গানটির ইংরেজি অনুবাদ করে একই সুর দিয়ে গাইতেনঃ You are only for me, O- you are only for me
এছাড়া তিনি নিজের ছবি দেখে নিজেকে এঁকেছেনও।
তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর তিনি অসাধারন একটি কবিতা লিখেছিলেন যা জনকণ্ঠ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল–
“মা আছে,
মা ধ্রুবতারা, আকাশে জীবিত অনন্ত,
মা অতিদুরে তারকালোকে;
মা অতি নিকটে হৃদয়ে-মননে;
মানুষের মৃত্যু হলেও মায়ের মৃত্যু হয় না কখনও”
সংসারী, বন্ধুবৎসল ও মাটির মানুষঃ
বড় মামাকে মনে করলে তাঁকে নিয়ে যে ঝাপসা স্মৃতিটা আমার মাথায় প্রথম আসে তা হল ধানমণ্ডি ৩৩ নম্বর রোডে তাঁর বাসা (এটাই সেই বাসা যে বাসায় ১৯৮৮ সালে বহুব্রীহি নাটকের শুটিং হয়েছিল)। তখন ১৯৮৭ সাল, মা বাবার সাথে তখন গিয়েছিলাম ঐ বাসায়। মনে পড়ে মামা সোফায় বসে কি যেন বলছিলেন। আর মামীও তখন বেঁচে ছিলেন। বড় মামার লাল গাড়ি, রমজান ড্রাইভার, সবাই আমার চোখে আজও ভাসে!
মামা তখন বড় মামী আর একমাত্র ছেলে জীসান হুসাইন রবিন (আমার মামাতো ভাই) কে নিয়ে থাকতেন। মামার বন্ধুরা তখনও আসতেন তাঁর বাসায়। তখন ঐ বাসার বারান্দায় মা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল জোনাকি পোকা দেখাতে। তখনকার বিশিষ্ট অভিনেতা-অভিনেত্রী হুমায়ুন ফরিদী এবং সুবর্না মোস্তফা সে সময়ে ছিলেন ঐ বাসায়। আমার মা বলেছেন যে সেইদিন সুবর্না মোস্তফা নাকি আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন।
মামাকে আমি কাঁদতে দেখিনি কখনও, ১৯৯৮ সালের আগে! ১৯৯৮-এর ৪ই জানুয়ারি বড় মামী মারা যান। ব্রেন হেমারেজের কারনে তাঁর মৃত্যু ঘটে। সেই প্রথম, সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে সবার থেকে লুকিয়ে মামাকে কাঁদতে দেখেছি। এরপর থেকে তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি বড়ই কুফা! নাহলে বউ মারা যাবে কেন?” খুব কষ্ট লাগত যখনি তিনি একথাগুলো বলতেন। দূর্ভাগ্যবশতঃ আমার ডিভোর্স হয় ২০১৯ সালে। তখন উনি আমাকে স্বান্তনা দিয়েছিলেন এই বলে, “তোর আর আমার, একটু মিল আছে আর একটু অমিল… মামা ভাগ্নে না? দেখ দুজনেরই বউ দুজনকে ছেড়ে চলে গেছে, হাহাহা!”
সত্যি ২০১৯ সালে, মামীর মৃত্যুর ২১ বছর পরেও তাঁর এই কথা শুনে চোখে পানি চলে এসেছিল।
লেখক রবিউলঃ
বেশ কয়েকটি আর্কিটেকচারাল এবং সাহিত্যের বই লিখেছেন। এছাড়াও কবিতা, উপন্যাস, শিশুদের বই এবং প্রবন্ধের ২৫টিরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন।
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বইসমূহ:
· কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে
· আরও উনত্রিশটি চাঁদ
· স্থিরবিন্দুর মোহন সংকট
· কর্পূরের ডানাঅলা পাখি
· আমগ্ন কাটাকুটি খেলা
· বিষুবরেখা
· দুর্দান্ত
· অমনিবাস
· কবিতাপুঞ্জ
· স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা
· যে নদী রাত্রির
· এইসব নীল অপমান
· অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ
· দূরন্ত কিশোর
· বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি
· নির্বাচিত কবিতা
· গল্পগাঁথা
· ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি, ইত্যাদি…
মামার লেখক-স্বত্তার সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। মামার বাসায় বিশিষ্ট লেখক, কবি, স্থপতি ছাড়াও অভিনেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিদেশী নানান মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। একদিনের কথা আমার মনে আছে, আমার মামাত বোন নোভা আর আমি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর গল্পের (কাকাবাবু) খুব বড় ভক্ত ছিলাম। মামা একদিন নোভাকে বললেন, “ সুনীলবাবু আসছে, আয় আয়!” তো সাথে আমিও সামনে গিয়েছিলাম, আর তাঁর থেকে অটোগ্রাফ পেয়েছিলাম। খুব অবাক হয়েছিলাম বটে, কারণ ওঁনার পা কাকাবাবুর মত অকেজো নয়, তবে নোভা খুব মন খারাপ করেছিল কারণ কাকাবাবুর সাথে চেহারায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর কোনই মিল ছিল না। এসব কথা আসলেই খুব ক্লিশে শোনালেও, ঐটুকু বয়সে মামা আমাদেরকে যে অভিজ্ঞতা দিয়েছিলেন, তা আর অন্য ১০টা ছেলে-মেয়ে কিন্তু পায় না!
কর্মে রবিউলঃ
রবিউল হুসাইন একাত্তরের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলা একাডেমি, কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক সমিতি, ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (IAB)-এর আজীবন সদস্য এবং চার বার সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর ট্রাস্টি, কচি-কাঁচার মেলা-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির একজন নির্বাহী সদস্য। তিনি শহীদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের প্রধান স্থপতি ও পরিচালক, ARCASIA (আর্কিটেক্টস আঞ্চলিক কাউন্সিল অফ এশিয়া)-এর সহ সভাপতি, CAA(আর্কিটেক্টস কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন)-এরভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং SAARCH (দক্ষিণ এশীয় আর্কিটেক্টস আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতি)-এর আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এর সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তাঁর কাজের কথাতেই মনে পড়ল, একদিন মামা আমাকে কচি-কাঁচার মেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখি অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ছবি আঁকছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম অঙ্কন প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। মামা বললেন তুই এখানে বস, আমি আসছি। আমি বসে বসে বিরক্ত হয়ে পড়লাম কারণ ঐদিন সেখানে মামা ছিলেন অনুষ্ঠানের বক্তা! কিছু সময় পরে আমি চেয়ার থেকে উঠে সামনে গিয়ে দেখি এক মেয়ে কাঁদছে, বড়জোর ৮ বা ১০ বছর বয়স হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছো কেন? সে বলল, তাঁর ছবির উপর একটা ছেলে রঙ ঢেলে দিয়েছে। আমি বললাম রঙ পেন্সিল দিয়ে আঁকো, বললো সেটা নাকি ও পারে না। আমি তখন স্কুলের ড্রয়িং বিষয়ের জন্য ড্রয়িং শিখতাম। তাই আমিই ওকে নদীর পাড়ে কলসি কাঁখে মেয়ে আর নৌকা এঁকে রঙ করে দিই। অবাক কাণ্ড হল ওইদিন ঐ মেয়েটাই দ্বিতীয় পুরষ্কার জিতে যায়! মেয়েটা যখন পুরষ্কার নিচ্ছিল, তখন আমার দিকে বার বার তাকাচ্ছিল আর ফিসফিস করে বলছিল “THANK YOU”! কেউ ব্যপারটা খেয়াল না করলেও মামা কিন্তু ঠিকই খেয়াল করেন। আর অনুষ্ঠান শেষে আমাকে জিজ্ঞেস করেন কি ব্যপার। আমি ভয়ে ভয়ে বলি এই হল কাহিনী। মামা হাসতে হাসতে শেষ। বললেন, “তাই নাকি? বাহ! কিন্তু কেউ দেখেনি তো?”…
আর আমি তো ভয়ে ছিলাম যে মনে হয় খুব বকা খেতে হবে। কিন্তু তিনি যেভাবে ব্যাপারটা মেনে নিলেন আর বাসায় আসতে আসতে আমাকে বোঝালেন যে – “মানুষকে উপকার করতে হয়, কিন্তু এমনভাবে না যাতে নিয়ম ভাঙ্গতে হয়। নিয়ম অথবা আইন ভেঙে কিছু করা যাবেনা”…
এরপর থেকে মানুষটার সম্পর্কে আমার ধ্যান ধারণাই বদলে যায়।
স্থাপত্যে রবিউলঃ
তাঁর উল্লেখযোগ্য ইনস্টলেশন ডিজাইন/আর্কিটেকচারাল কার্যসমূহ ছিল - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও স্বাধীনতা খিলান, খামার বাড়ি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ভবন, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিসৌধ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ভাসানী হল, মুজিব হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তন, একাডেমিক বিল্ডিং কমপ্লেক্স, ইত্যাদি ...
কমার্স কলেজের ছাত্র হিসাবে মামার আর্কিটেকচারাল কাজের সাথে আমার পরিচিতি তার আগের থেকে হলেও কলেজে গিয়ে প্রথমবার সময় করে সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ দেখার সৌভাগ্য হয়।
উনি একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “তোর কলেজে তো আমি কাজ করেছি, তোর ভাল লেগেছে?”
আমি বলেছিলাম, “হ্যা, কিন্তু আপনি সবসময় ইটের উপর কাজ করেন কেন?”
তখন আমি কাজের কোন ধরণ বুঝতাম না, চিনতামও না। কিন্তু আমার মুখে এই কথাটা শুনে মামা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। বললেন, “কেন তোদের কি এইসব কাজ ভাল লাগেনা? আর এই ইটের কাজ তো ভবিষ্যতেও আরও হবে, আরও জনপ্রিয় হবে দেখিস এই আর্কিটেকচারাল মেথড”।
আমি বললাম, “আমার ভাল লাগেনি তা তো বলিনি, বলেছি আপনি ইটের কাজই কি বেশি করেন?”…
উনি হেসে বলেছিলেন, “না, কিন্তু ইটের কাজ আমার ফেভারিট কাজগুলোর মধ্যে একটি!”
তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম মামার ইটের কাজগুলো, কোন ভিত ছাড়া যেভাবে তিনি ইটের ব্যালেন্স রেখে কাজগুলো করতেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর!
জীবন দর্শন, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশঃ
মামার জীবন যৌবন জুড়েই ছিল বঙ্গবন্ধু, দেশ এবং স্বাধীনতা! প্রেম নিয়ে তিনি কবিতা লিখতে পছন্দ করতেন না, বরং দেশ, আবহমান বাংলা, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এগুলোই ছিল তাঁর পছন্দনীয়। ব্যক্তি জীবনে একাকীত্বের কারণে হয়ত তাঁর লিখায় কিছু বিরহের ছাপ থাকে, যদিও তা খুবই নগণ্য!
তিনি শয়নে-স্বপনে, মননে, চিন্তা-চেতনায়, চলনে-বলনে ছিলেন পুরোদস্তুর বঙ্গবন্ধু-অনুসারী! এমন অনেকদিন গেছে যে পারিবারিক আলোচনা হচ্ছে আর তাঁর ভেতর হঠাৎ তিনি নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর কথা, তিনি বোঝাতে চেষ্টা করতেন সবাইকে যে এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কি করতেন।
কেউ যদি পাকিস্তানকে অনুসরন করে তাহলে তাকে উনি সামনে বসেই কথা শুনিয়ে দিতেন যে বাংলাদেশকে কিভাবে শোষণ করেছে এবং পাকিস্তানের এখন কি দশা হয়েছে। উনি খুবই বিরক্ত হতেন তাঁদের প্রতি যারা বাংলাদেশকে ভালবাসেনা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চায়না, বঙ্গবন্ধুকে মানেনা। উনি বলতেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা কি কষ্ট আর ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে তাই যদি না জানো তাহলে তুমি কিসের বাঙালী হলে?”
বাংলাদেশের উন্নতি তাঁর একটা স্বপ্ন ছিল! বাংলার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বঙ্গবন্ধু এসবই ছিল তাঁর জীবন দর্শন!!
পুরষ্কারের থলিঃ
ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১৮ সালে একুশে পদক প্রদান করেছেন।
· ২০০৯ সালে কবিতায় তাঁর অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
· এছাড়াও অগণিত কবিতা সম্মেলনে কবি হিসাবে তিনি পুরষ্কার পেয়েছেন।
· বহু স্থাপত্যকলায় অবদানের জন্য তিনি নানান সময়ে নানান পুরষ্কার পেয়েছেন।
· ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (IAB) এর থেকে তিনি স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন।
· এছাড়াও কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক সমিতি এর মতন নানা প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি অগণিত পুরষ্কার পেয়েছেন।
শেষ তবুও শেষ নয়ঃ
এই অমায়িক, হাস্যাোজ্জ্বল, কর্মঠ, জ্ঞানী ও প্রতিভাবান মানুষটি ২৬ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, সকাল ৬টার দিকে ৭৬ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি আইসিইউ বেডে তাঁকে নেওয়ার জন্যে বলা হলেও আইসিইউ বিভাগ কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য একটি আইসিইউ বেড বরাদ্দ করতে পারেনি। রক্তে প্লাটিলেট এবং হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেডের স্বল্পতার কারণে এমন বিরাট ব্যক্তিত্বশালী মানুষটার জীবন যে থমকে যেতে পারে, তা ভাবতেই কেমন লাগে! সত্যিই অনেক আগেই চলে গেলেন তিনি! দেশকে অকাতরে দিয়ে গেছেন, আরও অনেক কিছুই দিতে পারতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শহীদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের প্রধান স্থপতি ও পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পুরোভাগে থেকে ‘সাহসী’ মানুষ হয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাওয়া রবিউল হুসাইন চলনে, বলনে, কাজে, আঁকায়, ইশারায়, ভঙ্গিতে, সকলভাবেই ছিলেন কালজয়ী! আর মৃত্যুর পরেও তিনি হয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়ী! রবিউল হুসাইন আমার মামা ছিলেন, এতে আমার গর্ব হয়!!
মামা !
জগৎ হতে তিরোধানে সালাম শ্রদ্ধা মাখা
সুখে থেকো, ভাল থেকো, এই আমাদের আশা!

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার শেষ প্রহর - অর্ক আশফাক

সময়ের ঠেশে বেঁচে থাকা - অর্ক আশফাক

The Slow Ascend of Winter - Arko Ashfaque