একশৃঙ্গীর গুহা এবং এলডোরাডোর কাহিনী - কুমার উৎপল
বিজ্ঞান সাময়িকী জ্ঞানগুল এর নববর্ষ সংখ্যাটা হাতে নিয়ে চমকে উঠি। আবারো স্বর্ণজ্বর শুরু হয়েছে! তবে তা গোপন রাখছে সবাই।কেউই প্রকাশ্যে তার কথা স্বীকার করছে না। স্বর্ণ সন্ধানীরা আবারো উঠে পড়ে লেগেছে। সেই সাথে স্পেলোলজিরা কজন মিলে মানে গুহাশাস্ত্রবিদরাও। আমি নড়ে চড়ে বসলাম।
আমার মতে পত্রিকাটির নাম হওয়া উচিত ছিল "সবার আগে"। কেন না এই পত্রিকার লেখক সাংবাদিকরা ঘটনা ঘটার এত আগেই তার রটনা শুরু করে যে লোকে তাকে আমলই দিতে চায় না। কিন্তু আমি দিই। আমার মতো অনেকেই দেয়। আমার মনে আছে বহু বছর আগে পত্রিকাটি লিখেছিল আমাদের আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো টের পাবার অনেক আগেই কুকুর, হাত্ হাঙর, আরো অনেক প্রাণীই ভূমিকম্প বা জলোচ্ছ্বাসের আভাস তাদের আচার আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। লোকে সে সময় “ছ্যা ছ্যা” করে উঠেছিল। এখন শুনি এ নিয়ে গবেষণার অন্ত নাই। বিভিন্ন দেশের মধ্যে এখন নাকি রীতিমত প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেছে। কার আগে কে রহস্যটা উদঘাটন করবে তা নিয়ে।
হবেই তো ! রহস্যটা উদঘাটন হওয়ার মানে কি বুঝিয়ে বলার দরকার আছে? কত বিশাল সম্ভাবনার দরজা যে খুলে যাবে সে ধারণারও অতীত। যাকগে, এসব কথা এখন থাক। আমি জ্ঞানগুল এর পাতা উল্টাতে থাকি-
ঘটনাটা কলম্বিয়ার। রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকের একটা হ্রদের পাড়ে চারজন পর্যটনকারী (সহজ বাংলায় যাদেরকে ট্যুরিষ্ট বলা হয়) বছর ত্রিশের এক যুবককে খুজে পায়। হ্রদটার নাম গুয়াটাভিটা। ওরা বলে “লাগুয়ানা গুয়াটাভিটা”। যুবকটাকে দেখে অপ্রকৃতিস্থ বলেই মনে হচ্ছিল। সারা মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। পায়ে জুতো নেই। পরণে ছেঁড়া জিন্স, ফালা ফালা শার্ট। হাতে পায়ে লম্বা লম্বা নখ। গায়ের রং সাদাই ছিল একসময়। মুখের হাতের পায়ের অংশগুলো এখন রোদে পুড়ে গাঢ় বাদামী হয়ে গেছে। চেহারাটা শুকনো। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল দীর্ঘদিন পানাহার জুটেনি। লোকটা কোন কথা বলছিল না। ফ্যাল ফ্যাল চোখে শুধু হ্রদের দিকে তাকিয়ে ছিল। দৃষ্টিতে কেমন যেন একটা অবিশ্বাস ও হতাশার ভাব ছিল। ট্যুরিষ্টরা যথাসম্ভব চেষ্টা করেও তার মুখ থেকে যখন কোন কথা বের করতে পারলো না তখন তারা ঠিক করলো লোকটাকে হাসপাতালে পাঠাবে। ওই জংগল থেকে কোন অনিচ্ছুক রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ওই চারজন ট্যুরিষ্ট স্থানীয় লোকজনদের সহায়তায় সেই অসাধ্য সাধন করে দেখালো। তারা লোকটাকে বোগোটার বিখ্যাত হাসপাতাল হ্যুসিতে অর্থাত কিনা হসপিটাল ইউনিভার্সিটারিও সান ইগনাশিওতে পাঠিয়ে দিল। জরুরী বিভাগের ডাক্তাররা লোকটাকে নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা করলো কিন্তু তার কি হয়েছে তার কোন কিনারা করতে পারলো না। অনেক রক্ত পরীক্ষা, এক্সরে, এম আর আই করেও যখন তার কোন শারীরিক সমস্যা খুঁজে পাওয়া গেল না তখন তারা তাকে মানসিক রোগী হিসেবে মনরোগ বিভাগে অর্থাত কিনা সাইকিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্টে ভর্তি করে তার দিল। পরের ঘটনাগুলোই হচ্ছে চাঞ্চল্যকর যেটা জ্ঞানগুল জানাচ্ছে।
মানসিক ব্যাধি বিশেষজ্ঞরা তার সাথে কথোপকথনের প্রচুর চেষ্টা করেও সফল হলো না। তারা ওই যুবকটার সাথে কোন যোগাযোগই করে উঠতে পারলো না। ঠিক সেই সময় মানসিক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর অক্টাভিও মঞ্চো বোগোটায় তাঁর গবেষনারবিষয় নিয়ে আলোচনা করতে একটা সেমিনারে এসেছিলেন । তিনি কাজ করছিলেন হিপনোসিস নিয়ে। এই হিপনোসিস বা সন্মোহন বিদ্যা তিনি দুরারোগ্য ব্যথার রোগীদের উপর প্রয়োগ করে যথেষ্ট সুফল পেয়েছেন। রোগীদের তিনি সন্মোহন করে তাদের মাথায় বিশেষ সাজেশন বা ধারণা ঢুকিয়ে দিতেন যে তাদের শরীরে কোন ব্যথা নেই। চার পাঁচটা বৈঠক বা সেশনের পরে অনেকগুলো রোগী বেদনানাশক কোন ওষুধ ছাড়াই দিব্যি চলতে ফিরতে পারছিল। তিনি তাঁর এই সব কিছু কেস স্টাডি দেখাতে এসেছেন বোগোটাতে এই হ্যুসিতেই। হ্যুসি একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করেছিল যার বিষয়বস্তু ছিল ক্রনিকপইনে ম্যানেজমেন্ট। দীর্ঘস্থায়ী বেদনাগ্রস্তদের বেদনাহ্রাসের উপায় নিয়ে আলোচনা সভা। প্রফেসর অক্টাভিওর পদ্ধতি এখনও পাশ্চাত্যের চিকিতসা জগতে কল্কে পায় নি।
এটুকু পড়ে আমি মুখ তুললাম। মনে মনে একটু হাসলাম। আজকের আকুপাংচারের স্বীকৃতি কবে মিলেছে পাশ্চাত্যের চিকিৎসা ব্যবস্থায়! আমাআমেরিকান, মানে একাডেমী অব মেডিক্যাল আকুপাংচার তো সৃষ্টিই হলো সেদিন মাত্র, ১৯৮৭ সালে। অথচ চীনারা দুই হাজার বছরেরও আগে এর ব্যবহার শিখেছিল। তাদের বলেছিল শরীরের মধ্যে চী নামক শক্তির চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে অসুখের সৃষ্টি হয়। আকুপাংচার এই চী শক্তির চলাচলের পথকে মসৃন করে রোগীকে সুস্থ করে তোলে। আমি ফের লেখাতে ডুব দিলাম।
উপায়ান্তর না দেখে শেষ চেষ্টা হিসেবে মানসিক ব্যাধি বিশেষজ্ঞরা মিলে প্রফেসর অক্টাভিওকে একবার কেসটা দেখার জন্যে অনুরোধ করলেন। প্রফেসর যুবকটার ফাইল হাতে নিলেন। দেখলেন নামের জায়গায় লেখা আছে দেসকনসিদো বাংলায় যার মানে আগন্তুক।সব ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট দেখলেন। তার সাইকিয়াট্রিক রিপোর্টও দেখলেন। দেখে শুনে শুধু বললেন, হুম ইন্টারেস্টিং, আমি কেসটা দেখতে পারি। গভীর সন্মোহনের মাধ্যমে তিনি যুবকটার সাথে একটা যোগাযোগ তৈরী করতে সমর্থ হলেন। তিনি বিস্মিত হলেন জেনে যে যুবক স্পানিশ ভাষা জানে। তার স্পানিশ ভাষাতে করা প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলো সে স্পানিশ ভাষাতেই দিচ্ছিল। কথা বলার ধাঁচ দেখে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হচ্ছিল যে সে শুদ্ধ স্পানিশই বলছে যা তার মাতৃভাষা না হয়ে যায় না। সত্যিই তাই। প্রশ্নোত্তরে সে জানালো সে স্পেনের লোক। স্পেনের আলিকান্তে শহরে তার বাড়ি। ভালো ইংরেজীও শিখেছে। কিছুদিন আমেরিকায় পড়াশোনা করেছে। সে খুব অভিযান প্রিয়।একাকী জঙ্গলে অ্যাডভেঞ্চার করা তার নেশা। সে কারণে আমেরিকার সারভাইভাল ট্রেনিং স্কুল অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সে ট্রেনিংও নিয়েছে। কলম্বিয়ায় এসেছিল ঘুরতে আর সেই সাথে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে স্লথের ভূমিকা নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র তৈরী করার ইচ্ছেও তার ছিল। এ নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাথে সে একটু আলোচনাও করে রেখেছিল।
আমি স্লথ নামক প্রাণীটার ছবি দেখেছি শুধু, কখনো সামনা সামনি দেখিনি। চিড়িয়াখানায়ও না। তার যেমন নাম তেমনি নাকি আচার আচরণ। অত্যন্ত ধীরগতি তার চলা ফেরায়। ছবিতে দেখেছি লোমশ শরীর, লম্বা তার হাত পা। হাতে বাঁকানো লম্বা লম্বা নখ। পায়ে দুটো কি তিনটে আঙুল। বড় বড় চোখ। সাইজে ছোট খাট কুকুরের মতো হবে। স্লথগতির এই স্তন্যপায়ীর উপরে প্রামান্যচিত্র! ধৈর্য থাকতে হবে বৈকি! আবার পড়তে থাকি।
পিঠে সারভাইভাল ব্যাগ নোট বই আর গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে সেই যুবক গভীর থেকে গভীর জংগলের মধ্যে দিন দশেক হাঁটার পরে এক সময় বুঝতে পারলো যে তার মতো ঝানু লোকও পথ হারিয়ে ফেলেছে। তবে সে ঘাবড়ে যায় নি। কালিফোর্নিয়ার সারভাইভাল ট্রেনিং সে ভুলে যায় নি। একদিন দুপুরে হাঁটতে গিয়ে সে শুনতে পেল দূরে কোথাও থেকে ঢোলের শব্দ ভেসে আসছে। ঢোল মানুষ লোকালয় চিন্তাগুলো পর পর তার মাথায় খেলে গেলো। উদ্ধার সন্নিকট ভেবে সে শব্দের উৎস লক্ষ করে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। শব্দের উৎসটা যত কাছে বলে মনে হচ্ছিল আসলে সেটা ততটা কাছে ছিল না। জঙ্গলে নিস্তব্ধতার মধ্যে শব্দ অনেক দূরে ছড়িয়ে যায় সে জানে। সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। শব্দ থেমে গেলে খুঁজে পেতে কষ্ট আরো বেড়ে যাবে সেটা সে বিলক্ষণ বুঝতে পারছিল। শব্দের তীব্রতা অনেক বেড়ে গেলে সে বুঝলো সে কাছে এসে গেছে। একটু ভালো ভাবে জায়গাটাকে জরীপ করার জন্যে সে একটা উঁচু গাছ বেছে নিয়ে তার মগডালে চড়ে বসলো। সামনে তাকাতেই সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। তার সামনে নতুন একটা জগত উন্মোচিত হলো যেন। সে দেখলো বৃত্তাকার বিশাল এক হ্রদের পাড়ে এসে পড়েছে সে। নিখুঁত বৃত্ত, যেন কেউ আগে কম্পাস দিয়ে জমিতে দাগ কেটে তার পরে হ্রদটাকে খুঁড়ে তৈরী করেছে। শব্দটা আসছিল অল্প দূরে তারই একটা পাড় থেকে। সে লোকজনের আনাগোনাও দেখতে পাচ্ছিল।
পড়া থামিয়ে আমি একটু ভাবলাম। নিখুঁত বৃত্তাকার হ্রদ, কি করে সম্ভব! তবে কি ওই খানে বিশাল গোলাকার কোন উল্কাপিন্ড আছড়ে পড়েছিল লক্ষাধিক বছর আগে? তার পরে ধীরে ধীরে এলাকাটা হ্রদে রূপান্তরিত হয়? অসম্ভব নয়, যুক্তিতে এটাই খাটে। আমি আবার পড়ায় মনোনিবেশ করি।
আরো ভালো ভাবে দেখবে বলে সে আরো একটু উঁচুতে উঠতে গেলো। ঠিক তখনই সে দেখলো পাশের এক গাছ থেকে শেয়াল মুখো বিশাল এক বাদুড় তার দিকে তেড়ে আসছে। উড়ন্ত শেয়ালটার আক্রমন থেকে বাঁচার জন্যে সে তাড়াতাড়ি নেমে আসতে চাইল। আর বিপদটা ঘটলো তখনই। ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে সে ডাল ভেঙে নীচে পড়ে গেল। পড়তে পড়তে নীচের একটা ঝোপের ডাল জড়িয়ে ধরে ফেলে কোন রকমে বেঁচে যায় সে। পিঠের ব্যথা একটু কমলে যখন সে মাটিতে উঠে দাঁড়াল তখন সে দেখলো তার সামনে জনাচারেক লোক দাঁড়ানো। তাদের গায়ের রঙ বাদামী, ছোটখাট শরীর, পরণে খাটো কাপড় আর হাতে বল্লম। সে বুঝতে পারলো এই আদিবাসীরাই ঢোল বাজিয়ে উৎসব করছিল। ডাল ভাঙার শব্দ আর তার পতনের শব্দ তাদের কানে গিয়ে থাকবে। ঢোলের শব্দ তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে শুনশান নীরবতা। আরণ্যক পাখীদের কল ডাক মাঝে মাঝে সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছিল। সে উঠে দাঁড়াতেই ওই লোকগুলো দাঁত কিড়মিড় করে হাত পা নেড়ে কি যেন বললো। তারপর তারা তার দু হাত পীচমোড়া করে বেঁধে ফেলে তাকে টেনে হিঁচড়ে ওই দিকে নিয়ে চললো যে দিক থেকে ঢোলের শব্দ আসছিল। সে কোন বাধা দিল না। সে তো ওখানেই যেতে চেয়েছিল। অনতিপরেই হ্রদের পাড়ে উঠানের মতো একটা খোলা জায়গায় এনে তার তাকে ছুঁড়ে ফেললো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছেলে মেয়ে মিলিয়ে জনা ত্রিশেক লোক সে চারপাশে দেখতে পেল। সে দেখলো তার সামনে উঠোনের মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ারের উপর বয়স্ক এক লোক বসে আছে। লোকটা সম্পূর্ণ নগ্ন। সারা গায়ে তার সোনালী গুঁড়ো চিক চিক করছে। মাথায় মুকুট তাতে রঙবেরঙের পাথর আর পালক লাগানো। গলায় দাঁতের মালা, শিকার করা প্রাণীদের দাঁত দিয়ে গাঁথা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। লোকটার দুপাশে চেয়ার ঘেঁষে পাঁচজন বিভিন্ন বয়সের মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল। অদ্ভুত সুন্দর সব পোষাক তাদের। সে বুঝলো গোত্রপ্রধান ও তার স্ত্রীদের সামনে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। ওদের একটু পেছনেই একটা কাঠের খুঁটা পোতা আছে। খুঁটাটার উপর দিকটায় বিভিন্ন কারুকাজ করা। উঠানের এক পাশে খড় নয় তবে খড় জাতীয় কোন গাছ দিয়ে তৈরী কতগুলো ভেলা। পাশেই দশ বার জন মিলে ওই জাতীয় আরো একটা বড় একটা ভেলা তৈরী করছিল। ভেলাটা তৈরীর কাজ শেষই বলতে হবে। জলে ভাসানোর অপেক্ষা চলছিল মাত্র। ভেলার মধ্যে রাখা জিনিষ গুলো দেখে সে চমকে উঠেছিল। ওখানে রাথা ছিল ছোট ছোট কিছু মূর্তি। কিছু মানুষের আর কিছু জন্তু জানোয়ারের বলে মনে হলো তার। মূর্তিগুলো সোনার তৈরী। সে গোত্রপ্রধানের নগ্ন শরীরের দিকে তাকাল এবার। কোন সন্দেহ নেই যে তার গায়ে স্বর্ণালী কিছু নয়, ওগুলো সোনার গুঁড়োই। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! নিজের চোখে দেখেও তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। চারজন লোক দুর্বোধ্য ভাষায় কি যেন বলতে লাগলো। মনে হচ্ছিল সে কিভাবে গাছের মগডালে উঠে লুকিয়ে তাদের দেখছিল সেটা বর্ণনা করছিল। গোত্র প্রধানের চোখ দুটো ক্রোধে যেন ফেটে পড়ছিল। তার হাত ঘন ঘন মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছিল আর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠছিল। গোত্র প্রধান যে অসম্ভব রেগে গেছে এটা বোঝার জন্যে ভাষা জানার প্রয়োজন ছিল না। তার শরীরের প্রতিটি ভাবভঙ্গীই বলে দিচ্ছিল যে সে রেগে আগুন হয়ে আছে। আর ওই পাঁচজন মহিলাদের মধ্যে চারজনকে দেখেও বোঝা যাচ্ছিল যে তারা ভীষন ভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে।তাদের অন্দর মহলে অনধিকার প্রবেশ করাটা যেন কেউই বরদাশ্ত করতে পারছিল না। শুধু একজন ওদের মধ্যে কনিষ্ঠ যে তার মুখেই সে কোন রাগ দেখলো না। চোখা চোখি হতেই তার মনে হলো মেয়েটা যেন সূক্ষ্ম একটা হাসি দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালো। গোত্রপ্রধান এবার ডান হাতের তর্জনী উঠিয়ে কিছু একটা নির্দেশ দিলো। সাথে সাথে অনেকগুলো ঢোল একসাথে বেজে উঠলো। এবার অনেক দ্রুত লয়ে। চারজন লোক যারা তাকে ধরে নিয়ে এসেছিল তারা তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এবার খুঁটিটার সাথে বেঁধে ফেললো। তার সামনে কাঠ জড়ো করে তাতে আগুণ জ্বালান হলো। মাঠের সবকটা ছেলে এবং তাদের সাথের মেয়েগুলো মিলে আগুন এবং তাকে ঘিরে নাচতে থাকলো। ছেলেগুলোর হাতে বর্শা। গোত্র প্রধান এবং তার স্ত্রীরা তা দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিল। তাদের এত আনন্দের মাঝে ছোট স্ত্রীটাকে তার মনে হলো বিষাদগ্রস্ত। ঢোলের শব্দের সাথে তার হৃদপিন্ডের ধুকধুকানিও বেড়ে চলেছিল। সে বুঝতে পারছিল একটু পরেই তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। পেছনে বাঁধা হাতটাকে ছাড়াবার চেষ্টা করলো বহুবার। কিন্তু শক্ত বাঁধনটা খোলা বা ছেঁড়া কোনটাই তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। উপরে সূর্যের দিকে আঙুল দিয়ে ছোট স্ত্রীটা কি যেন ইঙ্গিত করলো মনে হলো। গোত্র প্রধান ঝটপট দাঁড়িয়ে গেল। সে বারবার সূর্য এবং তার ছায়ার দিকে তাকাতে থাকল। ছায়া তখন তার ক্ষুদ্রতম অবস্থানে। সূর্য ঠিক মাথার উপরে। গোত্রপ্রধান এবার তার লোকজনকে চেঁচিয়ে কিছু একটা বললো যেন। ঢোলের দ্রুততাল বদলে অন্য রকম একটা তাল শুরু হল মৃদু লয়ে। নাচ বন্ধ করে লোকজন এবার ভেলাগুলোর দিকে দৌড়ে গেল। চার পাঁচজনে মিলে একেকটা ভেলা উঠিয়ে নিয়ে তারা জলের দিকে এগিয়ে গেল। গোত্রপ্রধান আর তার স্ত্রীরাও তাদের সাথে জলের দিকে এগিয়ে গেল। খুব তাড়া ছিল তাদের। ভাসানের লগ্ন পার হলে যেন অশুভ কিছু ঘটে যেতে পারে। মাথার উপরে কড়া রোদ। সামনে জ্বলন্ত আগুন। গরমে সে দরদর ঘামছিল। একসময় সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল না ক্ষুত পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তার মনে নেই। তার হুঁশ ফিরলে সে অনুভব করলো কে যেন তার বাঁধনটা খোলার চেষ্টা করছে। সে চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করলো। দেখলো সেই মেয়েটা যে তাকে দেখে মিষ্টি হেসেছিল, গোত্রপ্রধানের সেই ছোট স্ত্রীটা। মেয়েটা সে চোখ খুলেছে দেখে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে কথা না বলার জন্যে ইশারা করলো। দ্রুত বাঁধন মুক্ত করে মেয়েটা তাকে এক হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর তার হাত ধরে দৌড়াতে থাকলো। সে সামনে তাকিয়ে দেখলো দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। কি ঘটছিল এ ব্যাপারে চিন্তার অবকাশ ছিল না। সে বুঝতে পারছিল বাঁচতে হলে তাকে দৌড়াতে হবে মেয়েটার দেখানো পথে। সূর্যটা অনেকটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সন্ধ্যের আগেই তাকে নিরাপদ কোন জায়গায় পৌঁছাতে হবে। কতক্ষণ ধরে দৌড়ছিল তার মনে নেই। মেয়েটা মাঝে মাঝে থেমে দিক ঠিক করে নিচ্ছিল। তাকেও তখন থামতে হচ্ছিল। জংগলের পথে দিক-চিহ্নহীন ভাবে ছোটার পরিনতি কি হতে পারে তার চাইতে এখন ভাল কে জানে।একসময় মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়লো। হাতের ইশারায় পাহাড়ের একটা দিক নির্দেশ করে বললো, কুয়াভা। তারপর বাম হাতের তর্জনীটা মাথায় শিংয়ের মতো উঁচু করে ধরলো। এরপর দুহাতের আঙুল দিয়ে পরপর কিছু যেন দেখাল। প্রথমে চারটা আঙুল, তার পর পাঁচটা, তারপর তিনটা, তারপর সাতটা, তারপর তিনটা, তারপর চারটা আঙুল দেখাল।
তার পর এক মুহূর্তের নীরবতা। মেয়েটা তার চোখে চোখ রাখলো। তাকে একটু আনমনাও দেখাল। ওই একটা মাত্র কথা ওই একটা মাত্র মুহূর্তের আনমনা ভাব। মেয়েটি এবার দুহাত বাড়িয়ে তাকে আলিঙ্গন করলো এবং আলতো ভাবে তার ডান গালে একটা চুমু খেল। তারপর ঘুরে গিয়ে সোজা উল্টোদিকে তার বাড়ির পথে দৌড়াতে শুরু করে দিল। কিছুক্ষণ মেয়েটার চলার পথের দিকে তাকিয়েছিল সে তারপর আবার দৌড়। লক্ষ পাহাড়ের ওই দিকটা যেদিকটা মেয়েটা নির্দেশ করেছিল। পায়ে চলার সর্পিল রাস্তাটা ক্রমেই সরু হচ্ছিল সময়এক সেটা হারিয়েই গেল। সূর্য এবং পাহাড়ের অবস্থান দেখে তবুও সে ছুটে যাচ্ছিল।সে জানে সন্ধ্যার আগেই তাকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে হবে।সে দৌড়াচ্ছিল আর দৌড়াচ্ছিল। বিকেল হয়ে গেছে কবেই। সন্ধ্যে নামি নামি করছিল। তার পা আর চলছিল না। মেয়েটা যে দিকে যেতে বলেছিল সে দিকটায় অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে। তবুও সে সেই দিকেই যেতে থাকলো। এক সময় দেখলো অন্ধকারে তেমন কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। হাঁটতেও তার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। শরীরটাও ছেড়ে দিচ্ছিল তার। একসময় সে সত্যি সত্যিই বসে পড়লো। একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করবে মনে করেছিল কিন্তু সে এতই ক্লান্ত ছিল যে বসার প্রায় সাথে সাথেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম যখন ভাংলো তখন দেখলো তার চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। মাথার উপরে বাদুড়দের পাখা ঝাপটানি আর চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল। অনুভব করছিল গায়ের উপর দিয়ে ইঁদুর ছোটাছুটি করছে, রাতের প্রাণীরা এখন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বিকট গন্ধও তার নাকে আসছিল। তার প্রচন্ড ক্ষুধাও লেগেছিল। এখন এই অবস্থায় খাবার খুঁজতে যাওয়া আর আত্মহত্যায় চেষ্টা করা একই কথা। সে ঝিম মেরে পড়ে থাকলো। ভাবতে লাগলো মেয়েটা তাকে কি বলতে চেয়েছিল? কুয়েভা মানে গুহা সে তা জানে। কিন্তু বাম দিকে শিং মত কিছু একটা দেখিয়ে সে কি বোঝাতে চেয়েছিল? আর আঙুলগুলো দেখিয়ে সে কি বোঝাতে চেয়েছিল? শীতল একটা স্পর্শে তার ভাবনায় ছেদ পড়লো। কিছু একটা তার ডান হাতের উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। সে আর কেউ নয়, একটা সাপ। সে দম বন্ধ করে পড়ে থাকলো। একটওু নড়া চড়া করা যাবে না। তাহলে ওটা রাগ করতে পারে। আর রাগ করলে সেটা শুধু ছোট্ট একটা চুমু দেবে মাত্র। ওই একটা চুমুই তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবে। এখন মরার জন্যে মোটেও প্রস্তুত নয় সে। তার কত কিছু যে দেখার বাকী আছে! সে নিশ্চল পড়ে থাকলো।
উষার প্রথম সোনালী তীর আকাশ ভেদ করে গেল একসময়। রাতের আতংককে পরাজিত করে অবশেষে সূর্যোদয় হলো। এলো বহু প্রতিক্ষিত সকাল। সে চারপাশটা এবার দেখার চেষ্ট করলো। হালকা অন্ধকার যেটা ছিল সেটা তার চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছিল। সে দেখলো সে যেখানে শুয়ে আছে সেখানে শুধু বিষ্ঠা আর বিষ্ঠা। গন্ধটা আসছিল সেখান থেকেই। দেখলো সে বিশাল এক গুহার মধ্যে শুয়ে আছে।
ছাদের উপর থেকে অনেকগুলো বাদুড় ঝুলছে। এরাই সারারাত দাপট দেখিয়েছিল। ক্ষুধাটা এবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। যে ভয়টা তাকে রাতে গ্রাস করে ফেলেছিল সেটা আর নেই সে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলো। খাবার খুঁজতে হবে। গুহা যখন তখন পাখীর বাসা না থেকে যায় না। সে গুহামুখের উপরের দিকে দেয়ালগুলোর দিকে কিছু পাওয়া যায় কি না খুঁজতে গেল। সে কাছে যেতেই একটা জায়গা থেকে কতগুলো পাখী ভয় পেয়ে উড়ে গেল। উপরের দিকের পাথরের একটা খাঁজে পাখীগুলোর বাসা দেখতে পেল এবং তার একটাতে সে চারটে ডিমও খুঁজে পেল। কাঁচা ডিমগুলো সে ভেঙে খেয়ে নিল। তার মনে হলো এত স্বাদের খাবার সে জীবনে কোনদিন খায় নি। আমারও মনে হলো সত্যিই তো। একমাত্র ক্ষুধার্তরাই জানে খাবারকে সন্মান করতে। ক্ষুধাটা কিছুটা নিবৃত্ত হলে তার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যায় অনেক। সে গুহা থেকে বের হবার পথ খুঁজতে থাকে। যে দিক থেকে এসেছে ওদিকে যাওয়া যাবে না। ভেতরের দিকে নিশ্চয়ই কোন রাস্তা থাকবে। মেয়েটাও তাই ইংগিত করে থাকবে। তাই সে পথের খোঁজে ক্রমশ গুহার অভ্যন্তরে ঢুকতে লাগলো। যতই সে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকলো বাইরের আলো ততই কমছিলো। একসময় পুরোটাই অন্ধকার হয়ে গেলে সে অন্ধদের মত হাতড়ে হাতড়ে দেয়াল ধরে পথ লাগল।
সে তার টর্চলাইটটার প্রয়োজন বিশেষ ভাবে অনুভব করছিল। পিঠের ব্যাগের মধ্যে ছিল সেটা। ক্যামেরাটাও। ওগুলো শেষবার ওই গাছতলাতে রেখেছিল। এখন কোথায় কি অবস্থায় কে জানে। মেয়েটার কথা আবার মনে হলো তার। সে এখন কি করছে?
একটা সময় পরে সে দেখতে পেল গুহার ভেতরে সরু একটা আলোকরেখা এসে পড়েছে। আলো আলো বলে তার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করছিল। তার মনে হচ্ছিল এবার নিশ্চয়ই সে পথ খুজে পাবে। সে ছাদের দিকে তাকাল। আলোটা ছাদের দিক খেকেই আসছিল। সে লক্ষ করলো কেমন যেন অস্বাভাবিক তেরছা ভাবে আসছে আলোটা। ভালো করে খেয়াল করে দেখলো সে। দেখলো সূর্যের আলো ছাদে বড় একটা স্ফটিকের টুকরোর উপরে পড়ে প্রতিসরিত হয়ে ভিন্ন কোণে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে শুধু। ওই দিকে বের হেবার কোন পথ নেই।
আলো আঁধারে চোখটা ধাতস্ত হলে সে চার পাশে তাকিয়ে দেখলো। আবছা আলোতে সে দেখতে পেল বিশাল একটা হল ঘরের মতো জায়গায় সে দাড়িয়ে আছে। তার এক দিকের দেয়ালে সোনালী সিংহ দরজা আর অন্য দেয়ালগুলোতে শুধু ছবি আঁকা আছে। অনেকগুলো ছবি তবে তার মোটিভ একই। ঘোড়ার মত দেখতে অদ্ভুত একটা প্রাণীর বিভিন্ন ভঙ্গির ছবি। তাদের মাথায় আবার চোখা একটা শিংও আছে। একশৃঙ্গী ঘোড়া! সে চিনতে পারলো ওটা ইউনিকর্ণ! ইউনিকর্ণ এর ছবি আকা হয়েছে গুহাটার দেয়ালে দেয়ালে।
অবিশ্বাস্য! এই প্রাণীটার অস্তিত্ব আছে কেউ বিশ্বাস করেনা। সবাই মনে করে ওটা কল্পলোকের প্রানী। এখন দেখছে সে বাস্তবেই সেটা ছিল এবং তারা এই এলাকাগুলোতে ঘুরে বেড়াত। এই গুহাবাসীরা নিশ্চয় প্রাণীটাকে কাছে থেকে দেখেছিল এবং সেটাকে ভালবাসতো। তা না হলে প্রাণীটার এতসব ভঙ্গিমার ছবি আঁকবে কি করে তারা। না দেখে শুধু কল্পনায় ভর করে এইসব ছবি আঁকা যেতে পারে না। আর কেনই বা এতগুলো কাল্পনিক ছবি আকবে তারা? তার মনে পড়লো তার নিজের দেশেই, আলতামিরাতে সে গুহাচিত্র দেখেছে। ফ্রান্সের লা কঁ তে সে গুহাচিত্র দেখেছে। এগুলোর বয়স তার চেয়ে অনেক পুরানো বলেই মনে হলো তার কাছে। অথচ কেউ তার খবর জানে না। গুহাচিত্রের ইতিহাসএখন নতুন করে লিখতে হবে সবাইকে। আর সেই কি না বহির্বিশ্বকে খবরটা দিতে পারবে! উত্তেজনার একটা ঢেউ তার মধ্যে বয়ে গেল। তবে তার আগে তো তাকে এখান থেকে বের হতে হবে।মেঝেতে চোখ পড়তে সে দেখতে পেল আধা পোড়া কাঠ পড়ে আছে কিছু। দেখে মনে হলো অতি সম্প্রতিই ব্যবহার হয়েছিল সেগুলো। চকিতে একটা ভাবনা তার মাথায় খেলে গেল। তবে কি এই জায়গাটার কথাই মেয়েটা তাকে বলেছিল? মশাল জ্বেলে সেও কি এসেছিল এখানে। তা না হলে এসব সে জানবে কি করে। এটাই তাহলে সেই কুয়াভা মেয়েটা যার কথা বলেছিল সে নিশ্চিত হলো। কুয়াভা ডেল ইউনিকর্ণিও। একশৃঙ্গীর গুহা। সে এবার সামনের দরজাটার দিকে এগোল। হালকা অন্ধকারেও দরজাটা চকচক করছিল। সোনালী রঙ এই বিশাল দরজাটার।সোনারই তৈরী। তা না হলে এত বছরে তার ঔজ্জ্বল্য মলিন হয়ে যেত। দরজার গায়ে কতগুলো মানুষ ও কিছু জন্তুর মূর্তি সাঁটা আছে। একই রকম মূর্তি সে গোত্র প্রধানের কাছে দেখেছিল। তবে এগুলো সাইজে বহুগুন। বড়োভেতরে ঢোকার সে কোন উপায় খুজে পেল না। সে দেখতে পেল তার মাথার উচ্চতায় দরজার সাথে দশটা হাতল লাগানো। দেখতে অনেকটা গাড়ির গিয়ারের মতই। সে হাতলগুলো ধরে অনেক টানাটানি করলো কিন্তু দরজা খুললো না। মেয়েটার কথা তার আবার মনে পড়লো সে কি কোন সূত্র দিতে চেষ্টা করেছিল আঙুল দিয়ে। সে সংখ্যাগুলো মনে করার চেষ্টা করলো। চার পাচ তিন সাত তিন চার। মনে পড়লো তার। সে ভাবলো প্রথমে ডান তা না হলে বাম দিক থেকে সে নম্বর অনুসারে হাতল টেনে দেখবে দরজা খুলে কিনা। সেই হিসেবে সে ডান দিক থেকেই শুরু করলো। প্রথমে চার নম্বর হাতল ধরে টান দিল, তার পর পাচ নম্বর। এভাবে তিন নম্বর, সাত নম্বর, আবার তিন নম্বর তার পর চার নম্বর হাতল ধরে টান দিল। সে ঘর্ঘর একটা শব্দ শুনতে পেল এবং সেই সাথে দেখলো দরজাটা দেয়ালের ভেতরে আস্তে আস্তে ঢুকে গেছে। সে তখন ভেতরে যাবারএকটা পথ দেখতে পেল এবং সে ভেতরে ঢুকে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে দেখলো ঘর্ঘর শব্দ তুলে দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো কোন হাতল লাগানো নাই তাতে। তার উল্টো দিকে ফেরার পথ এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে এগুনো ছাড়া তার আর উপায় নাই। অন্ধকার চারপাশে। স্ফটিকের আলো যেটা ছিল আবার অন্ধকারে পথ চলতে হচ্ছিল তার। দেয়াল ধরে ধরে এগুতে হচ্ছিল। পথটা ঘোরানো। তার মনে হচ্ছিল যেন ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়ার দিকে উঠতে যাচ্ছে সে। এভাবে ঘন্টা খানেক হাঁটার পরে সে দেখতে পেলো সামনের কোণা থেকে কমলা রঙের বিচ্ছুরণ আসছে। তার মনে কিছু আশা জাগলো, হয়তো এবার বের হবার পথের সন্ধান মিলবে। এগিয়ে গিয়ে বাঁক ঘুরতেই সে দেখলো সে যেন বিশাল কোন একটা মণিরত্নের দোকানের প্রদর্শনী কক্ষে এসে উপস্থিত হয়েছে। সোনায় মোড়া তার সব কটি দেয়াল। দেয়ালে তাক। তাকে বিভিন্ন ধরণের ছোট ছোট মূর্তি। কোনটা মানুষের কোনটা প্রানীর। কতগুলো গাছের আছে দেখলো। গোত্র প্রধানের কাছেও সে এজাতীয় মূর্তিই দেখেছিল। বড় বড় মূর্তিও আছে অনেক। ইউনিকর্ণের মূর্তিও আছে সেখানে। সেগুলো মেঝেতে বসানো। তারই কোন কোনটাতে সে দেখলো নানা রঙের পাথর বসানো আছে। দেখলো এখানেও উপরে ছাদের মধ্যে কয়েক জায়গায় স্ফটিক বসানো আছে আর সেখান থেকে তীর্যক আলো এসে দেয়ালে পড়ে জায়গাটাকে হলুদ কমলা সোনালী রঙের বর্নচ্ছটায় ভরিয়ে দিয়েছে। হঠাত তার মনে হলো সব কিছু মিলে যাচ্ছে।তার পূর্ব পুরুষদের মুখে মুখে যে সোনার দেশের কথা ঘুরে বেড়াতো যার জন্যে তারা হ্রদ সেঁচার চেষ্টাও করেছিল তার সন্ধান সে পেয়ে গেছে। এলডোরাডোর ঐশ্বর্য এখন সে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে। কথাটা মনে হতেই তার মধ্যে আবার শিহরণ বয়ে গেল। হৃদপিন্ডটা জোরে জোরে লাফাতে শুরু করলো। তার মনে হচ্ছিল কিছুই যেন আর তার নিয়ন্ত্রনে নেই। একদিনেই এতকিছুর ধাক্কা! সামাল দিতে পারবে কি সে? তার ভয় হচ্ছিল। সে ধীরে লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করলো। দেখলো কাজ হচ্ছিল তাতে।তার হৃদপিন্ডের ধুকধুকানি আস্তে শান্ত হয়ে এল।
আমি মনে মনে বললাম। হবে না আবার? এ হচ্ছে প্রাণায়াম। আমাদের যোগশাস্ত্রের অবদান। জেনেই কর আর না জেনেই কর, ফল তো পাবেই।
নিজেকে সামলে নিয়ে সে জায়গাটা ঘুরে দেখতে লাগলো। এক জায়গায় মেঝেতে মস্ত বড় একটা সোনার কড়াই দেখতে পেল সে। কড়াই ভর্তি সোনার গুঁড়ো। এত বড় কড়াই যেন একটা বাথটাব! সে নিজেও অনায়াসে শুয়ে থাকতে পারবে সেখানে। সে বুঝলো এখানেই গোত্র প্রধান এসে গড়াগড়ি খেয়েছিল। সেটা মনে হতেই খোঁজার উৎসাহটা তার দ্বিগুন হয়ে গেল। বের হবার রাস্তা অবশ্যই আছে। তাকে সেটা খুজে বের করতে হবে শুধু। সে এখান থেকে বের হতে না পারলে এসব আবিষ্কারের কথা আবার চাপা পড়ে যাবে। পৌরাণিক গল্প হয়ে যাবে একসময়। মেয়েটার কথা মনে হলো তার। সেকি আর কোন সংকেত দিয়েছিল? না। সে ভাবলো হয়তো সে এখানে আসার অনুমতি পায় নি। হতে পারে এখানে ঢোকার অধিকার শুধু মাত্র গোত্র প্রধান এবং তার প্রধান মহিষীরই আছে। সে যেটুকু জানতো তাই জানিয়ে তাকে সাহায্য করেছে এর বেশী কিছু সে নিশ্চয়ই জানতো না তার বিশ্বাস হলো। এখন তার নিজেকে নিজেই সাহায্য করতে হবে। সে ঘুরে ঘুরে চারপাশটা দেখতে থাকলো। একটা করে হাতল ওয়ালা পাঁচটা দরজা সে খুজে পেল। কিন্তু দরজাগুলোতে অনেক ঠোকাঠুকি করেও সে নিশ্চিত হতে পারছিল না কোন দরজাটা নিলে সে নিরাপদে বাইরে যেতে পারবে। সে ভয় পাচ্ছিল আগের দরজাটার মতো এটাও যদি বন্ধ হয়ে যায়! আর ওপাশে যদি কোন পথ না থাকে! সে আর কিছুই ভাবতে পারছিল না। মনকে শান্তনা দিলো সে, ধৈর্য ধরো। আবারো সে সব কটা দরজা পরীক্ষা করলো। তেমন বিশেষ কিছু পার্থক্য নেই তবুও তার মনে হচ্ছিল ওই ডান দিক থেকে দু নম্বর দরজাটায় শব্দ যেন একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে। কিছুটা ফাঁপা মতো। সে ঠিক করলো ওই দরজা দিয়েই সে বের হবার চেষ্টা করবে। যাই থাকুক না কেন কপালে! ঘরের ভেতরে বসে থাকলেও তো সেই একই দশা হবে।বাঁচার জন্যে তাকে একটা ঝুঁকি নিতেই হবে। সে তার সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলল। দুই নম্বর দরজার সামনে দাড়িয়ে সে গভীর একটা শ্বাস নিল তার পর হাতল ধরে টান দিল। দরজা খুললো না। তবে যেটা ঘটলো তার জন্যে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার পায়ের নীচ থেকে যেন হঠাত মাটি সরে গেল সে দেখলো সে শূন্যে ভেসে আছে এবং দ্রুত নীচে গড়িয়ে পড়ছে। ফাঁদ ফাঁদ! অন্ধকারের মধ্যে নীচে পড়তে পড়তে সে বুঝতে পারলো সে ফাঁদে পড়েছে। দরজাগুলো নয় তার পরীক্ষা করা দরকার ছিল মেঝে। বাইরে যাবার পথ লুকিয়ে ছিল মেঝেতেই যা তার মনেই আসেনি। এখন দেরী হয়ে গেছে! অন্ধকার..জলের শব্দ..জলের গন্ধ...কয়েক সেকেন্ড মাত্র! তার শরীর আছড়ে পড়লো জলে। ঝপাৎ শব্দ তুলে অনেক জল ছিটিয়ে পড়লো চার পাশে। পিঠে বুকে প্রচন্ড আঘাত লাগলো তার। জলে ডুবে যেতে যেতে সে টের পেল প্রচন্ড স্রোত সেখানে। তার মনে হল খরস্রোতা নদী না হলে জলপ্রপাতে পড়েছে নিশ্চয়ই। গতকাল গাছ থেকে পড়ে ব্যথা পেয়েছিল, আজ নতুন করে আবার জলে পড়ে ব্যথা পেল। ব্যথা নিয়ে অন্ধকারে স্রোতের সাথে সংগ্রাম করতে করতে তার অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে উঠছিল। স্রোতের টান আর ঘুর্ণীর মধ্যে শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করছিল সে। ক্লিফ ডাইভিং অভিজ্ঞতা তার ছিল কিন্তু অপ্রস্তুত ছিল বলে কাজে লাগাতে পারেনি। তিন বছর আগে সে থাইল্যান্ডের ফি ফি দ্বীপে এক সপ্তাহ থেকে অনেক ক্লিফ ডাইভিং করেছিল তারই কথা ভাবছিল সে। এক সময় প্রবল অন্ধকার গুহা থেকে সে আলোয় এসে পড়লো। টের পেল স্রোতের গতিও কিছুটা কম মনে হয়ে এসেছে। সে মাথা উঠিয়ে কূলের দেখা পাওয়া যায় দেখতে চেষ্টা করলো। দুপাশেই গাছপালা চোখে পড়লো তার তবে অনেক দূরে। সাঁতরে পাড়ে যাওয়া সম্ভব নয় এই শরীরে তার সে শক্তি নেই। স্রোতে ভেসে ভেসে যদি পাড়ে গিয়ে ঠেকে সে চেষ্টাই করতে হবে। সে কি ততক্ষণ পর্যন্ত এই স্রোতে ভেসে থাকতে পারবে? ভাবলো সে।
হঠাৎ স্পীডবোটের শব্দের মতো একটা শব্দ কানে এল তার। ডুব দিয়ে শব্দটা শোনার চেষ্টা করলো সে। জলে শব্দ আরো দ্রুত হয় সে জানে। সে নিশ্চিত হলো সেটা কোন স্পীডবোটেরই শব্দ হবে। সে এবার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার শুরু করলো।
-হেল্প! সেভ মি!
মিনিট দশেকের মধ্যে স্পীডবোটটাকে দৃষ্টিসীমানায় দেখা গেল কিন্ত তার মধ্যে কোন দিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখতে পেল না সে। চিৎকারের সাথে এবার হাত নাড়াও শুরু করলো। এবার স্পীডবোটের গতি একটু কমলো সে দেখতে পেল। দিক পরিবর্তন করে সেটা এবার তার দিকেই আসতে শুরু করলো। অবশেষে উদ্ধার! মনটা খুশী হয়ে গেল তার। দুই মিনিটের মধ্যেই সে দেখলো স্পীডবোটটা তার কাছে এসে থেমে গেছে আর সে দুজন কলোহাত বাড়িয়ে তাকে জল থেকে উঠিয়ে নিচ্ছে। একটু পরে সে নিজেকে আবিস্কার করলো বোটটার পাটাতনে। সেখানে সে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে হাঁফাচ্ছিল সে। চোখ খুললে সে খেয়াল করলো যারা তাকে জল থেকে উঠিয়ে নিয়েছে তাদের পরণে সৈনিকের পোষাক। তাদের দুজনকেই যে সে প্রথমে পুরুষ ভেবে নিয়েছিল সেটা ঠিক নয়। এদের একজন নারী। আর সেই নারীই এখন তার দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। এ কে ৪৭!
এ কে ৪৭?! রাশিয়ার মিখায়েল কালাশনিকভের অটোম্যাটিক রাইফেলটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরী হলেও এখনও যে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আছে জেনে আমি একটু চমৎকৃত হলাম।
সে একটু মদ নিয়ে তাদেরকে তার জীবন বাঁচানোর জন্যে ধন্যবাদ দিতে যাচ্ছিল। এখন সে দেখছে তারাই আবার ঘাতক হয়ে গেছে! কি বলবে ভেবে না পেয়ে সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলো ওদের দিকে। মেয়েটা রাইফেলের ঘোড়াতে আঙুল রেখেই তাকে এবার স্পানিশ ভাষাতে জিজ্ঞেস করলো, কে তুমি? আর এখানে কি করতে এসেছো? ঠিক ঠিক বল। না হলে গুলি করে আবার নদীতেই ফেলে দেব। ঘাম দিয়ে যেন তার জ্বর ছাড়লো। থাক না কথাতে অন্য জাতীয় টান। সে মেয়েটার কথা ঠিকই বুঝতে পারলো। সে এও বুঝলো এরা কঠিন ধাঁচের লোক, ফাঁকা কথা বলছে না। সত্যি কথা না বললে সত্যি সত্যিই এরা গুলি চালিয়ে দেবে।
সে তাদেরকে তার আদ্যন্ত ইতিহাস বলে গেল। তার অভিযানের কথা বললো। গোত্রপ্রধান আর তার ছোট স্ত্রীর কথা বললো, একশৃঙ্গীর গুহার কথা, এলডোরাডোর কথাও বললো তাদেরকে। কিছু বাদ দিল না তবুও তারা তাকে বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সত্যি কথাটা বলার জন্যে চাপ দিচ্ছিল। সেও তাদের বার বার তার একই ইতিহাস শুনিয়ে গেল। সত্যি কথা হলে যে কোন সময় উল্টে পাল্টে যে ভাবেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন উত্তর তো একই হবে। এই সাধারণ ব্যাপারটা কেন তারা বুঝছে না এটা ভেবে সে একটু বিরক্তই হলো। ওরা তখন এ ওর দিকে তাকাচ্ছিল আর হাসছিল। সে বুঝছিল তারা তার কথাকে কোন পাত্তাই দিচ্ছেনা পাগল প্রলাপ বকছে বলে ধরে নিয়েছে।
মেয়েটা সব শুনে বললো, কিছু খাও এখন। তার পর ঘুমাও। সে তার জন্যে কিছু খাবার পানীয় এবং গায়ে দেবার জন্যে একটা কম্বল এনে দিল। মেয়েটা এবার তার পরিচয় দিল। বললো তার নাম এমি। সাথের ছেলেটার নাম কামিও। তারা ফার্ক গেরিলা যোদ্ধা। ফার্ক বা রিভলিউশনারী আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া যে গেরিলা যুদ্ধ করে আর বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে সেটা আমি জানতাম। কিন্তু তারা যে স্পীডবোট নিয়ে ঘুরে বেরাবার মতো সাহস রাখে সেটা আমার জানা ছিল না। তাদের জনপ্রিয়তা এখন বেড়েছে সেটা এখন বুঝতে পারলাম।
এমির দেয়া খাবার পানীয় তার উপরে কম্বল জুটেছে। খাওয়া শেষ হলে সে প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। কতক্ষন ঘুমিয়েছিল তার মনে নেই। ঘুম ভেঙেছিল এমির গা ধরে নাড়া দেয়াতে। তোমাকে এখানে নামিয়ে দেবো আমরা। এখানে একজন ডাক্তার আছেন। উনি খুব ভালো ডাক্তার। উনিই তোমার দেখভাল করবে এখন। তোমার চিকিৎসা দরকার। আমরা তাকে কিছু টাকা কড়িও দিয়ে রেখেছি। তুমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত উনার ওখানেই থাকতে পারবে। একটু সুস্থ হলে উনি তোমাকে শহরে পৌঁছে দেবেন। সেখান থেকে তুমি তোমার দেশের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। এসো, এখন নামো। তোমাকে ডাক্তারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। এমি তার হাত ধরে বোট থেকে নেমে আসতে সাহায্য করলো। দেখলো পাড়ে একজন দাড়িওয়ালা বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ওলা! মানে হ্যালো। তার ভাষাও স্পানিশ। এমি তাকে আলিঙ্গন করে আবার বোটে উঠে পড়লো। সে কিছুক্ষণ তার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকলো। সে ভাবলো এই এমি, গোত্রপ্রধানের ছোট স্ত্রী, এরা দেবদূত না হয়ে যায় না!
বুড়ো ডাক্তারটার বাড়ি আর ডাক্তার খানা একই জায়গা। উনি বাড়িরই একটা অংশকে বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং সেটাই তাঁর চেম্বার বা ডাক্তারখানা। ওখানে তার অভিযানের ইতিহাস আবার নতুন করে খুলে বলতে হলো। সব শুনে উনি বললেন, তোমার বিশ্রাম দরকার। তুমি খুব ক্লান্ত। বিশেষ করে এখন তোমার মগজকে বিশ্রাম দিতে হবে। আমি তোমাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি ওটা খেলে তোমার ভালো হবে। তারপর উনি ভেতরে চলে গেলেন। টুক টুক করে হামানদিস্তায় বাড়ি পড়ার মতো কিছু শব্দ আসতে থাকলো বাড়ির ভেতর থেকে। কিছুক্ষণ পরে ভেতর থেকে উনি যখন বেরিয়ে এলেন তখন সে দেখলো তাঁর হাতে একটা ছোট বাটি।
- “নাও, এক চুমুকেই ওষুধটা খেয়ে নাও”। ডাক্তার বাটি এগিয়ে দিলেন।
সে দেখলো বাটিতে সবুজ রঙের তরল কিছু রয়েছে। বনজি কোন ওষুধ যা ডাক্তার নিজের হাতে বানিয়েছে এই মাত্র সে বুঝতে পারলো। সে এক চুমুকেই ওষুধটা খেয়ে ফেলল। ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর সে অনুভব করলো তার মাথা কেমন যেন করছে। কেমন জানি ঝিম ঝিম ভাব লাগছে। সামনে ডাক্তারের চেহারাটাও যেন অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। তার পর আর কিছু মনে নাই তার।
পরদিন সকালে প্রফেসর অক্টাভিও মঞ্চো মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সামনে তার রিপোর্ট পেশ করলেন। তিনি বললেন, কোন স্মৃতি ধ্বংসকারী ওষুধের বিষক্রিয়ায় তার এই হাল হয়েছে। ওই বুড়ো ডাক্তার তাকে যে ওষুধ খাইয়েছিল সেটা তার স্মৃতিকে ধ্বংস করতেই খাইয়েছিল। আমার বিশ্বাস সে সেটা জেনে শুনেই করেছিল। রোগীর রক্ত নিয়ে এবার টক্সিক কিছু উপাদানের পরীক্ষা করা হোক। কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ওই উপাদান এখনও আমাদের জানা আছে বলে মনে হয় না।একজন প্রশ্ন করলো, ডাক্তার কেন সেটা করতে যাবে। তার লাভ কি তাতে?
-লাভ নয়। হয়তো কোন ক্ষতি ঠেকাতে! ডাক্তার হয়ত চায় না একশৃঙ্গীর গুহা এলডোরাডের কক্ষের খবর আজকের সভ্য সমাজ জানুক। জানলে পরে তো তারা হৈ হৈ করে ওখানে যেতে চাইবে। জায়গাটার পবিত্রতা নষ্ট করে দেবে। ডাক্তার হয়ত সেটা চায় না। প্রফেসর অক্টাভিও মঞ্চো উত্তর দিলেন। বুড়ো ডাক্তার আমার মনে হয় ওদেরই কেউ। প্রফেসর আবার একটু যোগ করলেন।
-ডাক্তার চাইলে তো তাকে মেরেই ফেলতে পারতো! তা সে করলো না কেন? তা হলেই তো সব চুকে যেত। আরেকজন জানতে চাইলো।
-তা যেত। কিন্তু তা করেননি উনি। আমার মনে হয় এটা উনার এথিক্সে করতে দেয় নি। উনি ডাক্তার, মানুষ মারা তাঁর কাজ নয়। তাই উনি এক্ষেত্রে একটা উপায় বেছে নিয়েছিলেন। উনি এমন ওষুধ প্রয়োগ করেছিলেন যাতে তাঁর রোগীটির বিশেষ বিশেষ স্মৃতি লোপ পায় এবং তাই হয়েছে। আমাদের রোগী তাই ওই দুই বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই মনে করতে পারছে না। সিলেকটিভ মেমোরী লস হয়েছে তার! আমার বিশ্বাস বিষক্রিয়া ধীরে কমে আসবে। আমিও সন্মোহনের মাধ্যমে আরো তথ্য যোগাড় করতে পারবো। প্রফেসর তার ধারণা ব্যক্ত করলেন।
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতার মধ্যে কাটলো। কেউ আর নতুন কোন প্রশ্ন করলো না।
জ্ঞানগুল এবার কিছু তথ্য জানাচ্ছে-
সেদিন সন্ধ্যায় চারদিক ঢাকা একটা ডেলিভারী ভ্যান এসে হ্যুসির সামনে এসে থেমেছিলো। সেখান থেকে চারজন পুলিশের ইউনিফর্মধারী লোক এসে সবার সামনে রোগীটাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কোথায়? কেউই জানে না ।
রোগীর সেবার জন্যে নিয়োজিত প্রধান নার্সটা পরদিন কাজে আসে নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাতে দুজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ ডেলিভারী ভ্যান নিয়ে এসে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কোথায়? কেউই জানে না ।
পরদিন সেমিনারে প্রফেসর অক্টাভিওর পেপার পড়ার কথা ছিল। আসেন নি। কারণ সেই একই। রাতে দুজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ ডেলিভারী ভ্যান নিয়ে এসে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কোথায়? কেউই জানে না ।
কলম্বিয়ার পুলিশ সংবাদ সন্মেলন করে ঘটনাগুলোর সাথে পুলিশের যোগাযোগের কথার তীব্র প্রতিবাদ করেছে। তারা ঘটনাগুলোর জন্যে জোর তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। ঘটনা আরও একটা আছে। জ্ঞানগুল একটা ছবি ছাপিয়েছে। কারো বাম হাতের একটা ছবি। তারা দাবী করছে ওই ছবিটা সেই রোগীর বাম হাতের। ছবিটা পাওয়া গিয়েছিল প্রধান সেবিকার অফিস মোবাইলে যা এখন পুশিশ জব্দ করে নিয়েছে। ছবিটাতে একটা ইউনিকর্নের বা একশৃঙ্গীর ছবি দেখা যাচ্ছিল আর একটা নম্বর ৪ ৫ ৩ ৭ ৩ ৪ । জ্ঞানগুল মনে করছে, ভুলে যেতে পারে ভেবে সে কোডটাকে গুহায় পাওয়া পোড়া কাঠের কয়লা দিয়ে হাতে লিখে রেখেছিল যা কোন ভাবে প্রবল স্রোতের মধ্যেও টিকে গিয়েছিল।
জ্ঞানগুল এবার কতগুলি সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে, সেগুলো হল -
১. কলম্বিয়ান কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ঘটনার একটা গোপন তদন্ত করে দেখতে চাইছে। তাই জড়িত লোকজনদের গোপন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাপারটা তারা আমজনতাকে আগাম জানতে দিতে চায় না।
২. ফার্ক গেরিলারা বুঝতে পেরেছিল তারা লোকটাকে ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছে। তার কাছ থেকে তারা সহজেই একটা স্বর্ণখনির সন্ধান পেতে পারতো যা দিয়ে তারা যুদ্ধের ব্যয় ভার সহজে মেটাতে পারতো। সে ভুল তারা এখন শুধরে নিতে চাইছে।
৩. কলম্বিয়ান মাফিয়ারা তাদের অপহরণ করে থাকবে। উদ্দেশ্য, অল্প পরিশ্রমে বিশাল আয়। যেটা এলডোরাডো তাদের এনে দেবে।
৪. ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো। প্রফেসর অক্টাভিওর পদ্ধতি তাদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ব্যথার ওষুধের ব্যবহার কমে যাবে। সেই সাথে তাদের শেয়ার বাজারে ধ্বস নামবে।
৫. কোন গুহাশাস্ত্রবিদ বা গুহাশাস্ত্রবিদ্যায় আগ্রহী ধনকুবের যে ইতিহাসে নাম লেখানোর একটা সুযোগ পেয়েছে মনে করছে। একশৃঙ্গীর গুহাচিত্র আছে দেখাতে পারলেই তো কেল্লা ফতে হয়ে যাবে।
তবে আসল সত্য যে কি এখনো তা জানা যায় নি। জ্ঞানগুল এ নিয়ে আরো কাজ করছে জানালো। আমি তার পরবর্তী সংখ্যার জন্যে অপেক্ষা করে আছি।
------------------------
Comments
Post a Comment