নস্টালজিয়া থেকে লেখনী!

অনেক স্মৃতিতে ঘেরা ধানমণ্ডির আমার ছোট্টবেলার নীড়।
এ বাসাতেই কাটে আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবন মিলে জীবনের ২৫টা বছর।
সেজ খালার কল্যাণে এই বাসায় আসা, ছোট ভাই এর জন্মগ্রহণ, বাবার বিদেশগমণ এবং বাবা বিদেশ থাকাকালীন সময়ে বাবাহীন অবস্থায় আমি আর আমার ছোট ভাই এবং আমার মা কে তাঁর মায়ার বাঁধনে এ বাড়িতেই রেখে দেওয়া আর পড়াশোনা শেষ করে চাকরি জোগাড় করা পর্যন্ত আমাদের সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের তাড়নায় তাঁর জোরেই মূলত এ বাড়িতে থাকা হয়েছে। সুতরাং, বলা যায় যে আমার পরিবারের পিছনে তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ! তিনি আমাদের জন্য তখন না করলে ছোটবেলায় বাবাহীন জীবনটা আরও কঠিন ও রূঢ় হত।
আপন ছোট ভাই, তিন খালাতো বোন আর ১টি মাত্র খালাতো ভাই, আমরা সবাই তখন তো ঢাকা'তেই থাকতাম!! খালা খালু দেশ-বিদেশ যাওয়া আসার ভেতরেই ছিলেন। কতদিন গিয়েছে আমাদের সিনবাদ, রবিন হুড, মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড, হারকিউলিস, দ্যা ক্রিস্টাল মেইজ, ইত্যাদি, ব্যাটম্যান আর WWF /wCw রেসলিং দেখে, তাঁর কোনও ইয়ত্তা নাই। তখনকার দিনগুলো ছিল প্রতিদিন-ই ঈদের দিন! প্রতিদিন আমরা একসাথে পড়তাম, খেলাধুলা করতাম। মামা আমাদের বাইক-এ ঘুরাতে নিয়ে যেত।
শিশুপার্ক, মামা খালার বাসায় যাওয়া, ধানমণ্ডি লেক এ হাঁটতে যাওয়া, বাইসাইকেল চালানো, গল্পের বই কিনতে বই মেলা যাওয়া আর পড়া... ওহহ! কত্ত বিনিদ্র রজনী পার করেছি এই বাড়িতে, পড়াশোনা করার জন্য! আরও যে কত কিছু করতাম, সব তো এখন ঠিকমত মনেও পড়ছেনা!
মাঝে ১৯৯৯ সালে দুই বছরের জন্য কাঁঠালবাগান এলাকায় চলে গিয়েছিলাম। ২০০১ সালে আবার আসলাম এই বাসায়!
এরপর বড় হয়ে খালাতো ভাই-বোনেরা চলে গেল লন্ডন। আমি রয়ে গেলাম ঢাকায়। বাবা চলে এলো বাংলাদেশে, কিন্তু প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে। দুর্ভাগ্য যেন ছাড়ছিল না আমার পরিবারটা কে! পড়াশোনা করছিলাম, হঠাৎই প্রেম, নিজেরা নিজেরা বুঝে নিয়ে ধুম করে বিয়েও করে বসলাম!! কিন্তু বেশ বুঝছিলাম আমার এই অগোছালো জীবনে ওকে আনাটা হয়ত ভুল হয়েছিল! কিন্তু ভালবাসা না মানে কোনও বাঁধা! বয়স ছিল মাত্র ২৫, ও-ও রাজি ছিল বলে আমি কখনও ভয় পাইনি! ওকে ওর বড় ভাই যখন নিতে এলো, ও তাও গেলনা আমাকে ছেড়ে, সেদিন মনে হয়েছিল যে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পাওয়াটা বোধ হয় পেয়ে গিয়েছি! অনেক কষ্ট করেও ২জনে ছিলাম ঠিকঠাক! কখন পিছে ফিরে থাকাতে হয়নি। ওর দেয়া সাহস ও সহযোগিতা, আর আমার হার না মানা খাটা-খাটনি, অপরাজেয় মন মানসিকতা, এগুলো নিয়েই এগিয়ে চলছিলাম দুজন।
এরপর চলে গেল ৫টি বছর। পড়াশোনা শেষ, কিন্ত দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ছিল না! কোনভাবেই হয়না চাকরি! ২০১৬ তে একটা পাওয়ার পরেও ১৮মাস পর ছেড়ে দিলাম কারণ জাপানি কোম্পানি দেশ ছেড়ে দিবে! এক বান্ধবির সূত্রে ২০১৭ তে নতুন চাকরি পেলাম... এরপর কিছু দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি, কিছু অর্থাভাব, অসচ্ছলতা, কিছু ভালবাসা আর পাগলামি, এবং ওকে প্রতিদিন দেখে দেখে শক্তি সঞ্চয় করে চলেছিলাম আমি প্রতিনিয়ত... সব দুশ্চিন্তা ফেলে কাজ করে যাচ্ছিলাম এই আশায়, যে যাই হোক, আমি পারব সব ঠিক করতে। দুই ভাই চাকরি পাওয়ার পর নতুন বাসা ভাড়া করলাম সেন্ট্রাল রোডে। সেই জন্যই দীর্ঘ ২৫ বছর পর ছাড়লাম এই পুরনো লক্ষ স্মৃতির বাসা। সময়টা মে, ২০১৮।
আহহহহহ... কথাবার্তা স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়ছে কিঞ্চিত বে-লাইনে ... লাইনে ফিরে আসি!
যাই হোক, ধানমণ্ডির বাসাটা এখনো আমার খুব কাছে। মানে LITERALLY মনের কাছে তো বটেই, আমার নতুন বাসা থেকেও খুবই কাছে! ভাড়া হয়ে গেছে বলে আর যাই না! আর গত ৮ মাস কোনও কাজ নেই বলে পুরানো বাসাটির আশে পাশেও যাওয়া হয়না!
ভালই হয়েছে যে যাই না!!
  1. যেতেই যদি মন ডুকরে কেঁদে উঠে ??? মা বাবার সাথে কাটানো কোন স্মৃতি যদি আমায় নাড়িয়ে দেয়?
  2. যেতেই যদি বাড়ির ছাদে আর ঘরের ভিতর কাটানো ৫ বছরের প্রেমের কথোপকথন? যদি মনে পড়ে যায়, আমার হারানো, চাবি বন্ধ করে রাখা স্মৃতিগুলো? কিংবা আমার খাপছাড়া ভালবাসার মানুষটার সাথে এই বাড়িতে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা?
  3. যেতেই যদি মনে পড়ে যায় বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়গুলি? কত ঝগড়া, হই হুল্লোড় করে কাটিয়েছি, সময়গুলি যদি এসে আমায় HAUNT করে?
  4. যেতেই যদি মনে পড়ে যায় ছোটভাই এর সাথে খুনসুটি, খাওয়াদাওয়া, কাটানো মজার সময়গুলি? ছোটভাই কে নিয়ে রেসলিং খেলতাম, সেই মুহূর্তগুলি যদি মনে এসে আমাকে দোলা দেয়?
  5. যেতেই যদি মনে পড়ে যায় COUSIN দের সাথে খোশ-গল্পের কথা? কিংবা আমার evergreen বড় মামার সাথে প্রথম বারের মত বিয়ার, ভডকা এবং হুইস্কির গ্লাসে চুমুক মারা?
যাক গে, ভাল থেকো ধানমণ্ডির ২৫ বছরের পুরাতন নীড়!!
হয়ত আবার দেখা হবে ঐ পুরনো ক্লান্তি পরিত্রানের আবাস-স্থলে!
হয়ত বা হবেনা দেখা আর কখনই, কেই বা জানে!
ভাল থেকো!

Comments

Popular posts from this blog

অপেক্ষার শেষ প্রহর - অর্ক আশফাক

সময়ের ঠেশে বেঁচে থাকা - অর্ক আশফাক

The Slow Ascend of Winter - Arko Ashfaque